
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পথচলা সহজ ছিল না। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক জয় থেকে শুরু করে টেস্ট মর্যাদা অর্জন, ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল—প্রতিটি অধ্যায়ে কিছু অসাধারণ ক্রিকেটারের নাম জড়িয়ে আছে। তাদের ব্যাট, বল, নেতৃত্ব ও মানসিক দৃঢ়তা মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের বাংলাদেশ দল।
নিচে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ১০ ক্রিকেটারকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—তাদের পরিসংখ্যান, অবদান, স্মরণীয় মুহূর্ত এবং ক্রিকেটে প্রভাবসহ।

সাকিব আল হাসান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ICC অলরাউন্ডার র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে অবস্থান করেছেন—যা বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান।
টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটেই তিনি ৫,০০০+ রান এবং শতাধিক উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন। ২০১৯ বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স ছিল ঐতিহাসিক—৬০০-র বেশি রান ও ১০+ উইকেট নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য দেখান।
সাকিবের বড় শক্তি হলো ম্যাচের গতিপথ একাই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। ব্যাট হাতে মিডল অর্ডারে স্থিরতা, আবার প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক ইনিংস—সবকিছুতেই পারদর্শী। বল হাতে তার বাঁহাতি স্পিন বাংলাদেশের জন্য বহু ম্যাচ জিতিয়েছে।

মাশরাফি বিন মুর্তজা শুধু একজন বোলার নন, তিনি একটি অনুপ্রেরণার নাম। বারবার চোট পেয়ে হাঁটুর অস্ত্রোপচার করেও তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে এসেছেন।
তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় এবং পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে সিরিজে হারায়।
মাশরাফির সবচেয়ে বড় অবদান হলো দলকে বিশ্বাস করানো—“আমরাও পারি।” তার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব ও ডেথ ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

তামিম ইকবাল বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনারদের একজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৫,০০০+ রান সংগ্রহ করে তিনি বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন।
তার কভার ড্রাইভ এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা তাকে আলাদা করে। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে তার সাহসী ইনিংস আজও স্মরণীয়।
তামিমের ধারাবাহিকতা ও বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতা বাংলাদেশকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে বহু ম্যাচে।

মুশফিকুর রহিম বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের এক অনন্য নাম। তিনি দেশের প্রথম টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরিয়ান।
ছোট গড়নের হলেও তার মানসিক শক্তি অসাধারণ। চাপের মধ্যে ব্যাটিং করে দলকে রক্ষা করার বহু উদাহরণ রয়েছে তার ক্যারিয়ারে।
উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে দলকে সেবা দিয়েছেন তিনি।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ সেঞ্চুরিয়ান (২০১৫)। টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে তিনি বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়েন।
মিডল অর্ডারে তার ঠাণ্ডা মাথার ব্যাটিং এবং ম্যাচ ফিনিশ করার দক্ষতা বাংলাদেশকে বহু জয় এনে দিয়েছে।
তার নেতৃত্বেও বাংলাদেশ এশিয়া কাপে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।

মুস্তাফিজুর রহমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবির্ভাবেই আলোড়ন তোলেন। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়ে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দেন।
তার কাটার, স্লোয়ার ও ডেথ ওভারের দক্ষতা তাকে বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি বোলারদের কাতারে নিয়ে যায়। আইপিএলেও তিনি সফল হয়েছেন।

লিটন দাস আধুনিক যুগের টেকনিক্যালি সাউন্ড ব্যাটসম্যান। তার টাইমিং ও শট সিলেকশন অসাধারণ।
ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে তার সেঞ্চুরিগুলো তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উইকেটকিপিং দক্ষতাও তার বড় সম্পদ।

হাবিবুল বাশার বাংলাদেশের প্রারম্ভিক টেস্ট যুগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানদের একজন।
তার টেকনিক ছিল দৃঢ়, বিশেষ করে কভার ও স্ট্রেট ড্রাইভে। অধিনায়ক হিসেবে তিনি দলকে সংগঠিত করেন কঠিন সময়গুলোতে।
২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে তার অবদান স্মরণীয়।

আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পথিকৃৎদের একজন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেঞ্চুরি ছিল বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ শতক।
তিনি শুধু একজন ব্যাটসম্যানই নন, বরং দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির এক ভিত্তি নির্মাতা।
তার নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।

রুবেল হোসেন বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন একসময়। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার শেষ ওভারের স্পেল বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলে—যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
তার গতি, বাউন্স এবং বড় ম্যাচে সাহসী বোলিং তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
রুবেলের ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন থাকলেও বড় মঞ্চে পারফরম্যান্সের জন্য তিনি সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।