
২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে— ভালো সিনেমা কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এ বছর বক্স অফিস কাঁপানো ব্লকবাস্টার যেমন ছিল, তেমনি ছিল নীরবে মুক্তি পাওয়া, কিন্তু গভীর প্রভাব ফেলা অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র। আমার এই তালিকাটি তৈরি হয়েছে গল্পের গভীরতা, নির্মাণশৈলী, অভিনয়, সামাজিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত আবেগ— সবকিছুর সমন্বয়ে।
এখন চলুন একে একে দেখে নেওয়া যাক ২০২৫ সালের ১০ সেরা সিনেমা—

বছরের শুরুতেই মুক্তি পেয়ে এই ছবিটি যেন পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে নাড়িয়ে দেয়। ধর্ম, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত অপরাধবোধের জটিল সমীকরণকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার এবং সামাজিক ড্রামা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এমন এক সিদ্ধান্ত নেয়, যার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র পর্যন্ত। চিত্রনাট্যের সূক্ষ্মতা, সংলাপের ধার এবং আবেগঘন ক্লাইম্যাক্স— সব মিলিয়ে এটি শুধু বক্স অফিস হিট নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে ওঠে। দর্শক সিনেমা হল থেকে বেরিয়েও দীর্ঘ সময় ভাবনায় ডুবে থেকেছেন— এটাই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

“এটা তো স্রেফ একটা দুর্ঘটনা”— এই বাক্যটিই পুরো ছবির দার্শনিক ভিত্তি। কিন্তু সত্যিই কি সবকিছু কেবল দুর্ঘটনা? নাকি প্রতিটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে মানুষের অবচেতন সিদ্ধান্ত? এই চলচ্চিত্রটি ধীরে ধীরে উন্মোচন করে একটি পরিবারের ভাঙন, অপরাধবোধ এবং ক্ষমার গল্প। নির্মাতা অত্যন্ত সংযত ভাষায়, কোনো অতিনাটকীয়তা ছাড়াই, একের পর এক আবেগী স্তর খুলে দিয়েছেন। ক্যামেরার নীরব চলাচল, দীর্ঘ শট এবং সংলাপের মাঝখানে বিরতির ব্যবহার ছবিটিকে করে তুলেছে শিল্পমানসম্পন্ন ও হৃদয়ছোঁয়া।

সময়ের স্রোত, স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন— এই তিনটি উপাদানকে কেন্দ্র করে তৈরি এক অনুপম কাব্যিক চলচ্চিত্র। রেলপথ এখানে কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি সময়ের প্রতীক, বিচ্ছেদের রূপক। প্রধান চরিত্রের জীবনযাত্রা যেন ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যের মতো— কখনো দ্রুত, কখনো থেমে থাকা। সিনেমাটোগ্রাফি এতটাই শক্তিশালী যে প্রতিটি ফ্রেম আলাদা করে ছবি হয়ে দেয়ালে টাঙানো যায়। নীরবতার ভেতর যে শব্দ লুকিয়ে থাকে, এই চলচ্চিত্র তা শুনতে শেখায়।

ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যৎ, রিয়েলিটি শো সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির সমালোচনা— এই তিনের মিশেলে নির্মিত এক শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলার। ছবির কেন্দ্রে একজন সাধারণ মানুষ, যাকে বাঁচতে হলে দৌড়াতে হবে— কেবল শারীরিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও। যদিও বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি, তবু এর বার্তা এবং নির্মাণশৈলী একে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের তালিকায় স্থান দিয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো শুধু বিনোদন নয়; প্রতিটি দৃশ্যই সামাজিক বক্তব্য বহন করে।

একটি ছোট শহরের গল্প দিয়ে শুরু হলেও এটি আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত আদর্শ এবং সামাজিক বিভাজন— সবকিছু মিলে ছবিটি হয়ে উঠেছে সময়োপযোগী ও তীক্ষ্ণ। চরিত্রগুলো ধূসর— কেউ সম্পূর্ণ ভালো নয়, কেউ পুরোপুরি খারাপ নয়। সংলাপ এতটাই বাস্তব যে মনে হয় আমরা যেন কোনো টাউন হল মিটিংয়ে বসে আছি। ২০২৫ সালের রাজনৈতিক আবহ বোঝার জন্য এই ছবি এক অনন্য দলিল।

যুদ্ধ এখানে শুধু বন্দুক আর বিস্ফোরণের গল্প নয়; এটি মানুষের ভেতরের যুদ্ধের প্রতিচ্ছবি। একজন সৈনিকের ব্যক্তিগত ক্ষত, রাষ্ট্রের আদর্শিক লড়াই এবং সমাজের নীরবতা— সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি প্রশ্ন তোলে— প্রতিটি যুদ্ধের শেষে আসলে কে জয়ী হয়? দৃশ্য বিন্যাসে রয়েছে কাব্যিকতা, আর সংলাপে আছে তীব্র বাস্তবতা। এটি এমন এক চলচ্চিত্র, যা শেষ হওয়ার পরও ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ভালোবাসতে পারে? মানুষ কি যন্ত্রের মধ্যে সঙ্গ খুঁজে পেতে পারে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক আবেগময় সাই-ফাই ড্রামা। প্রযুক্তির ঝলকানি থাকলেও ছবির আসল শক্তি তার মানবিকতা। একাকিত্ব, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং আবেগের প্রোগ্রামিং— এই বিষয়গুলোকে নির্মাতা গভীর সংবেদনশীলতায় উপস্থাপন করেছেন। শেষ দৃশ্যটি দর্শককে নীরব করে দেয়— আমরা কি সত্যিই এতটা আলাদা যন্ত্রের চেয়ে?

শক্তি, অর্থ এবং নৈতিকতার সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে নির্মিত এক তীব্র কর্পোরেট থ্রিলার। গল্পটি শুরু হয় এক সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত থেকে, যা ধীরে ধীরে উন্মোচন করে দুর্নীতি, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্যক্তিগত পতনের কাহিনি। প্রতিটি চরিত্র নিজের অবস্থানকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে চায়, কিন্তু সত্য ধীরে ধীরে মুখোশ খুলে দেয়। দ্রুতগতির সম্পাদনা ও টানটান সংলাপ ছবিটিকে এক নিঃশ্বাসে দেখার মতো করে তুলেছে।

একটি শান্ত উপশহর— পরিপাটি বাড়ি, হাসিমুখ প্রতিবেশী, নিখুঁত সামাজিক জীবন। কিন্তু এই নিখুঁততার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে? এই ছবিটি ধীরে ধীরে উন্মোচন করে মানবিক হিংসা, সন্দেহ এবং গোপন অন্ধকারের স্তর। সাসপেন্স এত সূক্ষ্মভাবে তৈরি হয়েছে যে দর্শক প্রতিটি ছোট ইঙ্গিত ধরতে চেষ্টা করেন। শেষের টুইস্ট শুধু চমক নয়, বরং পুরো গল্পকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ দেয়।

হরর ঘরানার মোড়কে তৈরি হলেও এটি আসলে শোক, ক্ষতি এবং অপরাধবোধের গল্প। এক পরিবার হারানো প্রিয়জনকে ফিরে পেতে যে অন্ধকার পথে হাঁটে, তার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত আবেগী ও শৈল্পিকভাবে। ভয় দেখানোর চেয়ে ছবিটি বেশি কাজ করে মানসিক স্তরে— প্রতিটি দৃশ্য ধীরে ধীরে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। ক্লাইম্যাক্সে এসে দর্শক বুঝতে পারেন, সবকিছু ফিরিয়ে আনার মূল্য কখনো কখনো সহ্য করার মতো নয়। ২০২৫ সালের অন্যতম শক্তিশালী আবেগঘন হরর হিসেবে এটি দীর্ঘদিন মনে থাকবে।