
ফুটবল মানেই কেবল গতি আর শক্তি নয়—এটি শিল্পও। আর সেই শিল্পের এক অনন্য কারিগর ছিলেন মেসুত ওজিল। তার পায়ের নিখুঁত পাস, চোখধাঁধানো ভিশন আর খেলার বুদ্ধিমত্তা তাকে আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা প্লেমেকারে পরিণত করেছে। চলুন, তার জীবন ও ক্যারিয়ার ঘিরে ১০টি বিস্তৃত ও তথ্যসমৃদ্ধ চমকপ্রদ দিক তুলে ধরা যাক।
১৯৮৮ সালের ১৫ অক্টোবর জার্মানির গ্যালসেনকির্শেনে জন্ম নেন ওজিল। তুর্কি বংশোদ্ভূত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই ফুটবলে পারদর্শী ছিলেন। স্থানীয় ক্লাবে খেলার সময় তার অসাধারণ বল কন্ট্রোল ও পাসিং দক্ষতা নজরে পড়ে।
ওজিলের পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয় জার্মান ক্লাব Schalke 04-এ। এরপর তিনি যোগ দেন Werder Bremen-এ। ব্রেমেনে খেলার সময়ই তিনি ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত 2010 FIFA World Cup-এ ওজিলের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। তার সৃজনশীলতা ও গোল করার ক্ষমতা জার্মানিকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যায়। সেখান থেকেই তার বিশ্বখ্যাতি শুরু।
২০১০ সালে তিনি যোগ দেন Real Madrid-এ। কোচ জোসে মরিনহোর অধীনে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত হন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বহু গোল এসেছে ওজিলের পাস থেকে—যা তাদের বোঝাপড়ার প্রমাণ।
২০১৩ সালে তিনি ইংলিশ ক্লাব Arsenal-এ যোগ দেন। সেই সময় এটি ছিল ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে দামী ট্রান্সফার।
২০১৫-১৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ১৯টি অ্যাসিস্ট করে তিনি রেকর্ড গড়েন। ভক্তরা তাকে ডাকত “অ্যাসিস্ট কিং” নামে।
২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত 2014 FIFA World Cup-এ তিনি জার্মান দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানি বিশ্বকাপ জিতে নেয়—এটি তার ক্যারিয়ারের শীর্ষ অর্জন।
তার খেলার ধরন ছিল নিখুঁত পাসিং, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ ও গোল তৈরির দক্ষতা।
২০১৮ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট Recep Tayyip Erdoğan-এর সঙ্গে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে জার্মানিতে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে ওজিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে বলেন, তিনি বর্ণবাদ ও অসম্মানের শিকার হয়েছেন।
ওজিল বিভিন্ন সময়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য অপারেশনের খরচ বহন করেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপের বোনাস অর্থের বড় অংশ তিনি দান করেন ব্রাজিলের শিশুদের চিকিৎসায়। তার মানবিক উদ্যোগ ভক্তদের কাছে তাকে আরও সম্মানিত করেছে।
ইউরোপ ছাড়ার পর তিনি তুরস্কের ক্লাবগুলোতে খেলেন এবং ধীরে ধীরে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেন। ২০২৩ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা করেন।
তিনি কখনও খুব দ্রুতগতির খেলোয়াড় ছিলেন না, কিন্তু তার মস্তিষ্কের গতি ছিল অন্য সবার চেয়ে দ্রুত।
মেসুত ওজিল ছিলেন ফুটবলের এক নীরব শিল্পী। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও তিনি ছিলেন সংযত। তার পাসে গোল এসেছে, তার খেলায় সৃষ্টি হয়েছে মুহূর্ত—যা ভক্তরা বহুদিন মনে রাখবে।
ফুটবল ইতিহাসে প্লেমেকারদের কথা উঠলে মেসুত ওজিলের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।