
মানবসভ্যতার ইতিহাস আসলে এক অর্থে চিন্তার ইতিহাস। সভ্যতার প্রতিটি বড় অগ্রগতি—হোক তা বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, রাজনীতি কিংবা প্রযুক্তি—কিছু অসাধারণ মস্তিষ্কের অবদানে সম্ভব হয়েছে। তারা প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করেছেন, আর অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন।
এই লেখায় আমরা আলোচনা করব সর্বকালের সেরা ১০ জন মেধাবী ব্যক্তিত্বকে নিয়ে—যাদের আবিষ্কার, তত্ত্ব, শিল্পকর্ম বা দার্শনিক চিন্তা আজও মানবজীবনকে প্রভাবিত করছে। কেউ মহাবিশ্বের গোপন রহস্য উন্মোচন করেছেন, কেউ বিদ্যুতের আলো জ্বালিয়েছেন পৃথিবীতে, কেউ জীবন ও বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কেউবা মানবচিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন হাজার বছর আগে।

আলবার্ট আইনস্টাইন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রতীক। তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Theory of Relativity) স্থান ও কালের ধারণাকেই পাল্টে দেয়। বিখ্যাত সমীকরণ E=mc² দেখিয়ে দেয় ভর ও শক্তি একই মুদ্রার দুই পিঠ।
শুধু আপেক্ষিকতা নয়, ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট নিয়ে তার কাজ কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি মজবুত করে, যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তার চিন্তা ছিল গভীরভাবে তাত্ত্বিক—অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষামূলকভাবে তা যাচাই করতে সময় লেগেছে দশক কিংবা শতাব্দী।
আইনস্টাইনের অবদান পারমাণবিক শক্তি গবেষণার পথ খুলে দেয়। যদিও তিনি নিজে যুদ্ধবিরোধী ছিলেন, তার সমীকরণ থেকেই পারমাণবিক বোমার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়। তিনি ছিলেন কল্পনাশক্তি ও গণিতের এক অনন্য সমন্বয়।

নিকোলা টেসলা ছিলেন উদ্ভাবনের বিস্ময়। বিকল্পধারার বিদ্যুৎ (AC) ব্যবস্থা আধুনিক বিশ্বকে আলোকিত করেছে। তার আবিষ্কৃত AC ইন্ডাকশন মোটর ও পলিফেজ সিস্টেম আজকের বিদ্যুৎ বিতরণের মূলভিত্তি।
টেসলার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও ত্রিমাত্রিক কল্পনাশক্তি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি মাথার ভেতরেই যন্ত্রের নকশা সম্পূর্ণ কল্পনা করতে পারতেন। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় ৭০০টিরও বেশি পেটেন্ট অর্জন করেন।
অর্থলাভের চেয়ে মানবকল্যাণ ছিল তার লক্ষ্য। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বজুড়ে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের। তার অনেক ধারণা সময়ের বহু আগেই জন্ম নিয়েছিল—যা আজকের বেতার যোগাযোগ ও শক্তি প্রযুক্তিতে প্রতিফলিত।

আইজ্যাক নিউটন বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। গতি সূত্র ও সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র আমাদের মহাবিশ্বের গতিবিধি ব্যাখ্যা করে।
তার রচিত Principia Mathematica বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ক্যালকুলাস উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি গণিতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
নিউটনের কাজের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে আইনস্টাইন, প্ল্যাঙ্ক ও বোরের মতো বিজ্ঞানীরা নতুন তত্ত্ব নির্মাণ করেছেন। মানবজ্ঞান সম্প্রসারণে তার অবদান অপরিসীম।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ছিলেন রেনেসাঁর প্রকৃত “পলিম্যাথ”। শিল্প, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অ্যানাটমি—সবখানেই তার পদচিহ্ন।
তার আঁকা Mona Lisa ও The Last Supper বিশ্বশিল্পের অনন্য নিদর্শন। একই সঙ্গে তিনি ট্যাংক, উড়োজাহাজ, ডাইভিং স্যুটের নকশা করেছিলেন শতাব্দী আগে।
৪০০০ পৃষ্ঠার নোটে তিনি মানবদেহ, ভূতত্ত্ব ও প্রকৌশল নিয়ে গবেষণা লিখে গেছেন। কৌতূহলই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল ও মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে বিপ্লবী ধারণা দেন। তার “হকিং রেডিয়েশন” দেখায় যে ব্ল্যাক হোলও বিকিরণ করতে পারে।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি বিজ্ঞানের জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার বই A Brief History of Time বিশ্বজুড়ে পাঠকপ্রিয়।

গ্যালিলিও আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি দূরবীক্ষণ যন্ত্র উন্নত করে চাঁদের গর্ত, বৃহস্পতির উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি প্রমাণ করেন ভারী ও হালকা বস্তুর পতনের গতি সমান—এর মাধ্যমে অ্যারিস্টটলের মতবাদ খণ্ডন করেন।
প্রমাণভিত্তিক গবেষণার পথপ্রদর্শক হিসেবে তার ভূমিকা বৈজ্ঞানিক চিন্তার ভিত্তি গড়ে দেয়।
বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ছিলেন বিজ্ঞানী, লেখক, কূটনীতিক ও উদ্ভাবক। বজ্রনিরোধক আবিষ্কার করে তিনি বৈদ্যুতিক গবেষণায় অবদান রাখেন।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে কথা বলেন।
বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে তিনি রাজনীতি ও বিজ্ঞানের এক বিরল সমন্বয়।

অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন নাৎসি জার্মানির স্বৈরশাসক। তার রাজনৈতিক কৌশল ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা ছিল শক্তিশালী, কিন্তু তা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
তার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে, বিশেষ করে হলোকাস্টের মাধ্যমে।
ইতিহাসে তার নাম নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। বুদ্ধিমত্তা যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তার ফল কত ভয়াবহ হতে পারে—হিটলার তার উদাহরণ।

চার্লস ডারউইন বিবর্তন তত্ত্বের জনক। তার “Natural Selection” ধারণা দেখায় যে সব জীব এক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে।
On the Origin of Species গ্রন্থে তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির পরিবর্তন ব্যাখ্যা করেন।
জীববিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞানে তার তত্ত্ব গভীর প্রভাব ফেলেছে।

অ্যারিস্টটল ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। প্লেটোর ছাত্র এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের শিক্ষক হিসেবে তিনি জ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেন।
নৈতিকতা, রাজনীতি, যুক্তিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান—সবখানেই তার কাজ মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে।
পশ্চিমা সভ্যতার চিন্তাধারার বড় অংশই অ্যারিস্টটলের দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার কাজ আজও দর্শন ও বিজ্ঞানের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।