পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সেরা ১০ শয়তান শাসক

top 10 evil people
Category : ,

ইতিহাস শুধু সভ্যতার অগ্রযাত্রার কাহিনি নয়; এটি মানবতার অন্ধকার অধ্যায়গুলোরও সাক্ষী। যুগে যুগে এমন কিছু ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছেন, যাদের সিদ্ধান্ত, মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার লালসা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছে। যুদ্ধ, গণহত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সন্ত্রাস—এই শব্দগুলো কেবল ইতিহাসের পাতা নয়, অসংখ্য পরিবারের বেদনাময় স্মৃতির অংশ।

এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কেউ ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, কেউ সামরিক বিজেতা, কেউ চরমপন্থী সংগঠনের নেতা। কিন্তু একটি বিষয় তাদের একসূত্রে গেঁথেছে—তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে বিপুল প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।

তবে ইতিহাস বিশ্লেষণের সময় আমাদের আবেগ নয়, তথ্য ও প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিতে হয়। “অশুভ” বা “নৃশংস” শব্দগুলো মূল্যায়নের বিষয়ভিত্তিক ধারণা হতে পারে, কিন্তু গণহত্যা, নির্যাতন ও সন্ত্রাসের দলিলগুলো নির্দ্বিধায় প্রমাণ করে যে এসব শাসনামল মানবতার জন্য ছিল ভয়াবহ।

নিচে আলোচিত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য কাউকে মহিমান্বিত করা নয়; বরং ইতিহাসের ভুলগুলো বুঝে ভবিষ্যতে যেন মানবসভ্যতা আরও সচেতন হতে পারে—সেই শিক্ষা গ্রহণ করা।


১. Adolf Hitler

Image

জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের প্রধান স্থপতি হিসেবে ইতিহাসে কুখ্যাত। তার বর্ণবাদী ও ইহুদিবিদ্বেষী মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং আরও লক্ষ লক্ষ রোমা, প্রতিবন্ধী ও রাজনৈতিক বিরোধীকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করা হয়।

১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন, যার ফলে প্রায় ৭ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। নাৎসি রাষ্ট্রযন্ত্র, গ্যাস চেম্বার, বাধ্যতামূলক শ্রম ও চিকিৎসা-নির্যাতন ছিল তার শাসনের ভয়াবহ বাস্তবতা।

হিটলারের ব্যক্তিত্ব-নির্ভর প্রচারযন্ত্র জার্মান জনগণের একাংশকে উগ্র জাতীয়তাবাদে উসকে দেয়। তার শাসনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আজও ইউরোপীয় রাজনীতি ও বিশ্ব ইতিহাসে আলোচিত হয়।


২. Joseph Stalin

Image

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিন তার কঠোর শাসন ও দমননীতির জন্য কুখ্যাত। ১৯৩০-এর দশকের ‘গ্রেট পার্জ’-এ হাজার হাজার সামরিক কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড বা গুলাগে পাঠানো হয়।

সমবায় কৃষিনীতি ও শস্যসংগ্রহ অভিযানের ফলে ইউক্রেনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (হলোদোমোর) দেখা দেয়, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। স্টালিনের শাসনামলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তা কয়েক কোটি পর্যন্ত পৌঁছায় বলে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা।

তিনি ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন এবং ভয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তার নীতিগুলো সোভিয়েত সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।


৩. Vlad the Impaler

Image

ভ্লাদ তৃতীয়, যিনি ‘ভ্লাদ দ্য ইমপেলার’ নামে পরিচিত, ১৫শ শতকে ওয়ালাচিয়ার শাসক ছিলেন। শত্রুদের শাস্তি দিতে তিনি শূলবিদ্ধ করার মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতি ব্যবহার করতেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

তার শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় বলে ধারণা করা হয়। যদিও কিছু ইতিহাসবিদ বলেন, তার নির্মমতার গল্পের অনেকাংশই রাজনৈতিক প্রচারণা বা অতিরঞ্জন হতে পারে।

ব্রাম স্টোকারের উপন্যাস ড্রাকুলা চরিত্রটি আংশিকভাবে তার নাম থেকে অনুপ্রাণিত। তবু বাস্তব ইতিহাসে তিনি এক বিতর্কিত ও ভীতিকর শাসক হিসেবেই স্মরণীয়।


৪. Osama bin Laden

Image

আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।

তার নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে বোমা হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। উগ্র মতাদর্শের ভিত্তিতে তিনি বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেন।

২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে তিনি নিহত হন। তার কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক নিরাপত্তা নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।


৫. Mao Zedong

Image

চীনের গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ ও ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর জন্য সমালোচিত। শিল্পায়ন ও কৃষি সংস্কারের ব্যর্থ নীতির ফলে ১৯৫৮-৬২ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, তার নীতির ফলে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিপীড়ন করা হয়।

মাওয়ের ব্যক্তিত্বপূজা ও মতাদর্শিক কঠোরতা চীনা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে, যার প্রতিফলন বহু বছর স্থায়ী হয়।


৬. Pol Pot

Image

কম্বোডিয়ার খেমার রুজ নেতা পল পট ১৯৭৫-৭৯ সালে এক চরমপন্থী কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করেন। তার শাসনে প্রায় ২০ লাখ মানুষ অনাহার, শ্রমনির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারায়।

শহর খালি করে মানুষকে গ্রামে বাধ্যতামূলক শ্রমে পাঠানো হয়। শিক্ষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

তার শাসনামল ‘কিলিং ফিল্ডস’ নামে পরিচিত গণহত্যার জন্য ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।


৭. Heinrich Himmler

Image

নাৎসি এসএস প্রধান হাইনরিশ হিমলার হলোকাস্ট বাস্তবায়নের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। কনসেন্ট্রেশন ও এক্সটারমিনেশন ক্যাম্প পরিচালনায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এসএস ও গেস্টাপোর মাধ্যমে তিনি গণগ্রেফতার, নির্যাতন ও গণহত্যা পরিচালনা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মহত্যা করেন। ইতিহাসে তিনি নাৎসি অপরাধযন্ত্রের প্রধান কুশীলবদের একজন।


৮. Genghis Khan

Image

মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান ১৩শ শতকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করেন। তার সামরিক অভিযানে বহু শহর ধ্বংস হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয় বলে ধারণা করা হয়।

তবে একই সঙ্গে তিনি বাণিজ্যপথ (সিল্ক রোড) নিরাপদ করেন এবং প্রশাসনিক সংস্কারও আনেন।

তার উত্তরাধিকার নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে—তিনি একদিকে নির্মম বিজেতা, অন্যদিকে দক্ষ সাম্রাজ্য নির্মাতা।


৯. Kim Jong-il

Image

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-ইল কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি বজায় রাখেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষে বহু মানুষ কষ্ট ভোগ করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাজনৈতিক বন্দিশিবির, জোরপূর্বক শ্রম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তোলে।

তার শাসনব্যবস্থা আজও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচিত।


১০. Saddam Hussein

Image

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কঠোর শাসন ও বিরোধী দমনের জন্য পরিচিত। ১৯৮৮ সালে কুর্দি অধ্যুষিত হালাবজায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়।

তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের ফলে উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০০৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

crossmenu