২৪ ফেব্রুয়ারি : ইতিহাসের পাতা জুড়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

top 10 events on 24 february
Category : ,

২৪ ফেব্রুয়ারি—বছরের ক্যালেন্ডারে আর দশটা দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই দিনটি বহু স্মরণীয় ও শোকাবহ ঘটনার সাক্ষী। কোনো দিন রক্তাক্ত সহিংসতায় কেঁপে উঠেছে একটি ছোট শহর, কোনো দিন যুদ্ধক্ষেত্রে পাল্টে গেছে এক দেশের ভাগ্য। আবার কখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক সংঘর্ষ কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এই তারিখে।

ইতিহাসের প্রতিটি দিনই একেকটি গল্পের ভাণ্ডার। মানুষ যখন ঘুম থেকে জেগেছিল সেই সকালে, তারা জানত না যে তাদের জীবনের ঘটনাই একদিন বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির যুগে আমরা আজ সহজেই জানতে পারি—এই দিনে কী কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিলেন, এবং তার প্রভাব কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

চলুন, ২৪ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস ঘেঁটে দেখে নিই এমন দশটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ, সংস্কৃতি ও মানবিক ট্র্যাজেডির এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।


১) Uherský Brod shooting (২০১৫)

Image

২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চেক প্রজাতন্ত্রের ছোট শহর Uherský Brod-এর একটি রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ বন্দুক হামলা ঘটে। ড্রুজবা নামের রেস্তোরাঁয় ৬৩ বছর বয়সী জ্দেনেক কোভার গুলি চালিয়ে আটজনকে হত্যা করেন এবং পরে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ অবরোধের পর আত্মহত্যা করেন। মোট নয়জনের মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও গভীর শোক ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। চেক প্রজাতন্ত্রে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ছোট শহরের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রক্তাক্ত স্মৃতিতে পরিণত হয়।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, সহিংসতা কখনও কখনও এমন জায়গাতেও আঘাত হানে, যেখানে মানুষ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভেবেছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তাই চেক ইতিহাসে এক কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত।


২) United Airlines Flight 811 incident (১৯৮৯)

Image

১৯৮৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, হনোলুলু থেকে উড্ডয়নের পরপরই ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৮১১-এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বোয়িং ৭৪৭ বিমানের কার্গো দরজা হঠাৎ খুলে যায়, ফলে নিয়ন্ত্রণহীন ডিকমপ্রেশন সৃষ্টি হয় এবং কয়েক সারি আসন ছিটকে বাইরে চলে যায়। এতে নয়জন যাত্রী নিহত হন।

বিমানটি অবশেষে নিরাপদে Daniel K. Inouye International Airport-এ অবতরণ করে। তদন্তে কার্গো দরজার নকশাগত ত্রুটি চিহ্নিত হয়, যা পরবর্তীতে বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।

এই দুর্ঘটনা বৈমানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—প্রযুক্তিগত ছোট ত্রুটিও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


৩) Battle of Masaka (১৯৭৯)

Image

Uganda–Tanzania War চলাকালে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯-এ মাসাকা শহরে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তানজানিয়ার পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের গোলাবর্ষণের মুখে উগান্ডার সরকারি বাহিনী পিছু হটে।

এই যুদ্ধের পেছনে ছিলেন উগান্ডার শাসক Idi Amin, যার শাসনামল ছিল দমন-পীড়ন ও অস্থিরতায় ভরা। মাসাকা দখলের মাধ্যমে তানজানিয়ান বাহিনী উগান্ডায় অগ্রসর হয় এবং শেষ পর্যন্ত আমিনের পতন ঘটে।

এই সংঘর্ষ পূর্ব আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয় এবং উগান্ডায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।


৪) Yuba County Five disappearance (১৯৭৮)

Image

১৯৭৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ক্যালিফোর্নিয়ার চিকো শহরে একটি কলেজ বাস্কেটবল খেলা দেখে ফেরার পর পাঁচ যুবক নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়, কিন্তু একজনের আর খোঁজ মেলেনি।

এই ঘটনা “আমেরিকার ডায়াটলভ পাস রহস্য” নামে পরিচিত। তুষারাবৃত দুর্গম অঞ্চলে তাদের গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। কীভাবে তারা পথ হারালেন বা কী কারণে মৃত্যুবরণ করলেন—এ প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

রহস্যময় এই নিখোঁজ ঘটনা মার্কিন ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত কেস হয়ে আছে।


৫) Battle of Huế (১৯৬৮)

Image

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ১৯৬৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ভিয়েতনামী বাহিনী, নেতৃত্বে Ngô Quang Trưởng, হুয়ের দুর্গ পুনর্দখল করে।

Vietnam War ছিল স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। টেট আক্রমণের অংশ হিসেবে হুয়ে শহরে তীব্র নগরযুদ্ধ হয়। কয়েক সপ্তাহের লড়াই শেষে শহর পুনর্দখল করা হয়।

এই যুদ্ধ আমেরিকান জনমতে বড় প্রভাব ফেলে এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কৌশলে পরিবর্তন আনে।


৬) Battle of Kasserine Pass (১৯৪৩)

Image

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কাসেরিন পাসের যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। এটি ছিল আফ্রিকায় মার্কিন ও অক্ষশক্তির প্রথম বড় সংঘর্ষ।

World War II-এর এই অধ্যায়ে মিত্রবাহিনী বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে এই পরাজয় মার্কিন বাহিনীকে নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য করে এবং ভবিষ্যৎ অভিযানে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

এই যুদ্ধ দেখায়—প্রথম ব্যর্থতা ভবিষ্যৎ জয়ের ভিত্তি হতে পারে।


৭) Impeachment of Andrew Johnson (১৮৬৮)

Image

১৮৬৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি Andrew Johnson মার্কিন ইতিহাসে প্রথম অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট হন। প্রতিনিধি পরিষদ তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনে।

গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন নীতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। যদিও সিনেটে তিনি এক ভোটের ব্যবধানে খালাস পান, ঘটনাটি মার্কিন সাংবিধানিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করে।

এটি প্রমাণ করে—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন।


৮) Treaty of Yandabo (১৮২৬)

Image

১৮২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইয়ান্ডাবো চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের অবসান ঘটে।

এই চুক্তির ফলে ব্রিটিশরা আসাম, মানিপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে। বার্মা বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

চুক্তিটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপনিবেশিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা ব্রিটিশ ভারতের বিস্তারকে আরও সুদৃঢ় করে।


৯) Theatre Royal, Drury Lane অগ্নিকাণ্ড (১৮০৯)

Image

১৮০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের বিখ্যাত ড্রুরি লেন থিয়েটার আগুনে পুড়ে যায়। মাত্র ১৫ বছর দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।

পরে নতুন ভবন নির্মিত হয়, যা আজও ওয়েস্ট এন্ডের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। এই অগ্নিকাণ্ড লন্ডনের নাট্যজগতকে বড় ধাক্কা দিলেও, তা পুনর্গঠনের অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছিল।

সংস্কৃতির ইতিহাসে এটি এক দুঃখজনক কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।


১০) British invasion of Martinique (১৮০৯)

Image

Napoleonic Wars চলাকালে ১৮০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মার্টিনিক দ্বীপে ব্রিটিশ আক্রমণ শেষ হয় এবং ফরাসি অ্যাডমিরাল Louis Thomas Villaret de Joyeuse আত্মসমর্পণ করেন।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। পাঁচ বছর ব্রিটিশ দখলে থাকার পর দ্বীপটি ফেরত দেওয়া হয়।

এই ঘটনা নেপোলিয়নিক যুদ্ধের বৈশ্বিক বিস্তৃতি ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র তুলে ধরে।

crossmenu