
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে আরব–ইসরাইল সংঘাত একটি দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আরব বিশ্ব ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলমান। এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে ভূখণ্ড দখল, জাতিগত আত্মপরিচয়, ধর্মীয় আবেগ, শরণার্থী সংকট এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তির কূটনৈতিক প্রভাব। প্রতিটি যুদ্ধ শুধু সীমান্তের মানচিত্র পরিবর্তন করেনি, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আরব–ইসরাইল যুদ্ধগুলোকে কেবল সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এগুলো ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার লড়াই, অস্তিত্বের সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। কখনও আরব দেশগুলো একজোট হয়েছে, কখনও আলাদা আলাদাভাবে লড়েছে। অন্যদিকে ইসরাইল দ্রুত সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
এই ব্লগে ১৯৪৮ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সংঘটিত শীর্ষ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো। প্রতিটি যুদ্ধের পটভূমি, প্রধান ঘটনা, কৌশল এবং ফলাফল ২০০–২২০ শব্দে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে পাঠক একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক চিত্র পেতে পারেন।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করলে মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক ও লেবানন সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায়। যুদ্ধের মূল প্রেক্ষাপট ছিল জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা, যা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ইহুদি ও আরব রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। আরব দেশগুলো এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। যুদ্ধটি কয়েকটি ধাপে সংঘটিত হয়—প্রথমে অভ্যন্তরীণ গৃহসংঘাত, পরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ।
ইসরাইল সংগঠিত সামরিক কাঠামো ও বিদেশি সমর্থনের কারণে ধীরে ধীরে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। অপরদিকে আরব বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ১৯৪৯ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ইসরাইল জাতিসংঘ প্রস্তাবিত ভূখণ্ডের চেয়ে বেশি এলাকা দখলে রাখে। প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন, যা ‘নাকবা’ নামে পরিচিত। গাজা যায় মিশরের নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম তীর জর্ডানের অধীনে। এই যুদ্ধই ভবিষ্যৎ সংঘাতের ভিত্তি স্থাপন করে এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংকটকে স্থায়ী রূপ দেয়।

১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা গোপনে ইসরাইলের সাথে চুক্তি করে মিশরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। ইসরাইল সিনাই উপদ্বীপে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং ব্রিটিশ-ফরাসি বাহিনী সুয়েজ অঞ্চলে হামলা শুরু করে।
যুদ্ধ সামরিকভাবে সফল হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের মুখে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইল পিছু হটতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং সিনাই থেকে ইসরাইল সরে যায়।
এই সংঘাতের ফলে নাসের আরব বিশ্বে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং পশ্চিমা শক্তির প্রভাব দুর্বল হয়। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ কতটা প্রভাবশালী হতে পারে। সুয়েজ সংকট ভবিষ্যৎ আরব–ইসরাইল সংঘাতের জন্য রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

১৯৬৭ সালের জুন মাসে মাত্র ছয় দিনে সংঘটিত এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেয়। মিশর সিনাইয়ে সেনা সমাবেশ করে এবং তিরান প্রণালী বন্ধ করে দিলে ইসরাইল এটিকে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য মনে করে। ইসরাইল পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বিমান হামলায় মিশরের বিমানবাহিনী ধ্বংস করে দেয়।
পরবর্তী কয়েক দিনে ইসরাইল জর্ডান থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়া থেকে গোলান মালভূমি এবং মিশর থেকে গাজা ও সিনাই দখল করে। আরব দেশগুলোর সমন্বয়ের অভাব ও দ্রুত আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থতা তাদের পরাজয়ের কারণ হয়।
এই যুদ্ধের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ফিলিস্তিনি জনগণ নতুন করে ইসরাইলি দখলের অধীনে আসে। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্র হয়। যুদ্ধের পর জাতিসংঘের ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাস হয়, যেখানে দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। ছয় দিনের যুদ্ধ আরব বিশ্বে আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়।

১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ইয়োম কিপুরের দিনে মিশর ও সিরিয়া আকস্মিক আক্রমণ চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১৯৬৭ সালে হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখল করা। যুদ্ধের প্রথমদিকে মিশর সুয়েজ খাল অতিক্রম করে সিনাইয়ের কিছু অংশ পুনর্দখল করে এবং সিরিয়া গোলান মালভূমিতে অগ্রসর হয়।
ইসরাইল দ্রুত পুনর্গঠিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা আরব বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে এবং মিশরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক চাপ ও স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনার কারণে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল আরব–ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৭৯ সালে মিশর–ইসরাইল শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়। ইয়োম কিপুর যুদ্ধ আরব দেশগুলোর সামরিক আত্মবিশ্বাস কিছুটা ফিরিয়ে আনলেও রাজনৈতিক সমাধানের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।
নিচে বাকি ৬টি যুদ্ধ ২০০–২২০ শব্দের মধ্যে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১৯৮২ সালে ইসরাইল “অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি” নামে লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল লেবাননে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-কে উৎখাত করা এবং উত্তর ইসরাইলের সীমান্তে রকেট হামলা বন্ধ করা। ইসরাইলি বাহিনী দ্রুত দক্ষিণ লেবানন অতিক্রম করে রাজধানী বৈরুত ঘিরে ফেলে। দীর্ঘ অবরোধের পর পিএলও নেতৃত্ব তিউনিসিয়ায় সরে যেতে বাধ্য হয়।
তবে যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি। বৈরুতের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করে। লেবাননের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এই যুদ্ধের ফলে ইসরাইল কয়েক বছর দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করে এবং ইসরাইল–হিজবুল্লাহ সংঘাতের ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গাজা উপত্যকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের গণ-বিদ্রোহ শুরু হয়, যা দ্রুত পশ্চিম তীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন ‘ইন্তিফাদা’ নামে পরিচিত। এটি ছিল মূলত অসহযোগ, ধর্মঘট, পাথর নিক্ষেপ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে দখলবিরোধী গণপ্রতিরোধ।
ইসরাইল কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার ফলে বহু প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংঘাতের চিত্র প্রচারিত হওয়ায় বিশ্বমত ফিলিস্তিনি ইস্যুর প্রতি নতুনভাবে মনোযোগ দেয়। একই সময়ে হামাস রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
দীর্ঘ ছয় বছরের অস্থিরতার পর ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় এবং সীমিত স্বায়ত্তশাসনের পথ তৈরি হয়। প্রথম ইন্তিফাদা প্রমাণ করে যে সংঘাত শুধু সামরিক নয়, বরং জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমেও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

২০০০ সালে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক সফরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। এই সংঘাত ‘আল-আকসা ইন্তিফাদা’ নামেও পরিচিত। প্রথম ইন্তিফাদার তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী এবং সশস্ত্র সংঘর্ষপ্রধান।
হামাস ও অন্যান্য সংগঠন আত্মঘাতী হামলা চালায়, আর ইসরাইল ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত হয়।
এই পাঁচ বছরে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস গভীর হয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও কঠোর ও বিভক্ত করে তোলে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনাকে জটিল করে দেয়।
২০০৬ সালের জুলাইয়ে হিজবুল্লাহ ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে দুইজনকে আটক করলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়। ৩৪ দিনব্যাপী এই যুদ্ধে ইসরাইল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় এবং স্থল অভিযান পরিচালনা করে।
হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে হাজারো রকেট নিক্ষেপ করে। লেবাননের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং দক্ষিণ লেবাননে শান্তিরক্ষী বাহিনী জোরদার করা হয়। উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করলেও যুদ্ধটি দেখায় যে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিও ইসরাইলের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই সংঘাত ভবিষ্যৎ সীমান্ত উত্তেজনার ভিত্তি তৈরি করে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইল ‘অপারেশন কাস্ট লিড’ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল গাজা থেকে হামাসের রকেট হামলা বন্ধ করা। তিন সপ্তাহব্যাপী এই অভিযানে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা চালানো হয়।
গাজায় অবকাঠামো, সরকারি ভবন ও আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে অভিযান শেষ হলেও হামাস গাজায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এই সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং ইসরাইল–হামাস সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে আরও বৈরী করে তোলে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস আকস্মিকভাবে ইসরাইলের ভেতরে হামলা চালায়, বহু মানুষ নিহত ও অপহৃত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।
সংঘাত দ্রুত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়। গাজায় ব্যাপক বিমান হামলা, স্থল অভিযান ও অবরোধের ফলে মানবিক সংকট তীব্র হয়। হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততার আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও স্থায়ী সমাধান অধরাই রয়ে যায়। ২০২৩ সালের এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং আরব–ইসরাইল সংঘাতকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।