
পারস্য—যা আজকের Iran—মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। হাজার বছরের ইতিহাসে এই ভূখণ্ড অসংখ্য সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ধর্মীয় পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের সাক্ষী। আখেমেনীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সাসানীয়, সাফাভি, কাজার এবং আধুনিক ইসলামিক প্রজাতন্ত্র—প্রতিটি যুগে যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক মানচিত্র ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
কখনও গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষ, কখনও আরব মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ, কখনও অটোমান তুর্কিদের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই, আবার কখনও বৈশ্বিক শক্তির ছায়াযুদ্ধ—ইরানের ইতিহাসে যুদ্ধ কেবল সীমান্ত রক্ষার জন্য ছিল না; বরং তা ছিল ধর্ম, বাণিজ্যপথ, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং আদর্শিক আধিপত্যের লড়াই।
এই ব্লগে আমরা পারস্য বা ইরানের ইতিহাসের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

ম্যারাথনের যুদ্ধ ছিল আখেমেনীয় সম্রাট Darius I-এর নেতৃত্বে পারস্য সাম্রাজ্য এবং গ্রিক নগর-রাষ্ট্র Athens-এর মধ্যে সংঘটিত এক ঐতিহাসিক সংঘর্ষ। পারস্যের উদ্দেশ্য ছিল গ্রিসকে বশ্যতা স্বীকার করানো এবং বিদ্রোহ দমন করা। কিন্তু এথেন্স ও প্লাতেয়ার সম্মিলিত বাহিনী কৌশলী ফ্যালানক্স পদ্ধতিতে পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করে।
এই যুদ্ধে পারস্যের পরাজয় গ্রিক আত্মবিশ্বাসকে উজ্জীবিত করে এবং পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, পারস্য সাম্রাজ্য বুঝতে পারে যে গ্রিস দখল করা সহজ নয়। এই যুদ্ধ ভবিষ্যতের গ্রিক-পারস্য সংঘর্ষের ভিত্তি স্থাপন করে।

থারমোপাইলির যুদ্ধ ছিল পারস্য সম্রাট Xerxes I-এর বিশাল বাহিনী এবং স্পার্টার রাজা Leonidas I-এর ক্ষুদ্র সেনাদলের মধ্যে সংঘটিত। সংকীর্ণ গিরিপথে মাত্র ৩০০ স্পার্টানসহ কয়েক হাজার গ্রিক যোদ্ধা তিন দিন ধরে পারস্য বাহিনীকে আটকে রাখে।
অবশেষে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে পারস্য বাহিনী বিকল্প পথ খুঁজে পায় এবং গ্রিকরা নিহত হয়। যদিও পারস্য কৌশলগতভাবে জয়ী হয়, এই যুদ্ধ গ্রিকদের আত্মত্যাগ ও সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি পরবর্তীতে সালামিসের নৌযুদ্ধে গ্রিক বিজয়ের অনুপ্রেরণা জোগায়।

গউগামেলার যুদ্ধ ছিল পারস্য সম্রাট Darius III এবং মেসিডোনীয় সম্রাট Alexander the Great-এর মধ্যে চূড়ান্ত সংঘর্ষ। সংখ্যায় বিপুল পারস্য বাহিনী থাকা সত্ত্বেও আলেকজান্ডারের কৌশলী অশ্বারোহী আক্রমণ ও শৃঙ্খলিত বাহিনী পারস্যকে পরাজিত করে।
এই যুদ্ধের ফলস্বরূপ আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং পারস্য গ্রিক শাসনের অধীনে চলে যায়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটায় এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো আমূল বদলে দেয়।

কাদিসিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয় সাসানীয় সম্রাট Yazdegerd III-এর বাহিনী এবং আরব মুসলিম সেনাপতি Sa'd ibn Abi Waqqas-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যে। চার দিনব্যাপী তীব্র যুদ্ধে সাসানীয় সেনাপতি রুস্তম নিহত হন।
এই পরাজয়ের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয় এবং পারস্যে ইসলাম ধর্মের বিস্তার শুরু হয়। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে এটি ইরানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।

চ্যালদিরানের যুদ্ধ সংঘটিত হয় সাফাভি শাসক Shah Ismail I এবং অটোমান সুলতান Selim I-এর মধ্যে। অটোমানদের আগ্নেয়াস্ত্র ও কামান ব্যবহারের বিপরীতে সাফাভি বাহিনী প্রধানত অশ্বারোহী নির্ভর ছিল।
ফলাফল হিসেবে অটোমানরা বিজয়ী হয় এবং তাবরিজ দখল করে। এই যুদ্ধ ইরান-তুরস্ক সীমান্ত নির্ধারণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং সাফাভি সামরিক সংস্কারে পরিবর্তন আনে।

এই যুদ্ধ কাজার শাসক Fath-Ali Shah Qajar-এর আমলে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। ককেশাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত রুশ বাহিনীর কাছে পারস্য পরাজিত হয়।
১৮১৩ সালের গুলিস্তান চুক্তির মাধ্যমে পারস্য জর্জিয়া, দাগেস্তান ও আজারবাইজানের অংশ হারায়। এই যুদ্ধ পারস্যের সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

এই যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং কাজার পারস্যের মধ্যে সংঘটিত হয়, মূলত হেরাত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ব্রিটিশরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থে পারস্যের সম্প্রসারণ ঠেকাতে চেয়েছিল।
পারস্য পরাজিত হয়ে প্যারিস চুক্তিতে হেরাতের দাবি ত্যাগ করে। এর ফলে আফগানিস্তান ব্রিটিশ প্রভাবাধীন হয় এবং পারস্যের আঞ্চলিক প্রভাব কমে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে World War I-এ ইরান নিরপেক্ষ থাকলেও রাশিয়া, ব্রিটেন ও অটোমান বাহিনী তার ভূখণ্ডে লড়াই চালায়।
ফলাফল হিসেবে ইরান ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। যুদ্ধোত্তর সময়ে ব্রিটিশ ও রুশ প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হয় ইরাকি প্রেসিডেন্ট Saddam Hussein-এর আক্রমণের মাধ্যমে। সীমান্ত বিরোধ ও ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী উত্তেজনা ছিল মূল কারণ। আট বছরব্যাপী এই যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়।
শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু উভয় দেশই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

টুয়েলভ-ডে ওয়ার (Twelve-Day War) ছিল Israel এবং Iran-এর মধ্যে সংঘটিত একটি সশস্ত্র সংঘর্ষ, যা ১৩ জুন থেকে ২৪ জুন ২০২৫ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
এই যুদ্ধের সূচনা ঘটে যখন ইসরায়েল আকস্মিক হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। এই হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ নিহত হন। পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।
এর জবাবে ইরান ব্যাপক পাল্টা আক্রমণ চালায়। তারা ৫৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,০০০-এর বেশি আত্মঘাতী ড্রোন নিক্ষেপ করে, যা ইসরায়েলের বেসামরিক জনবসতি, একটি হাসপাতাল এবং অন্তত বারোটি সামরিক, জ্বালানি ও সরকারি স্থাপনায় আঘাত হানে।
সংঘাতের সময় United States ইসরায়েলের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে এবং ইরানের ছোড়া বহু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সহায়তা করে। ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি আল উদেইদ এয়ার বেসে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
অবশেষে ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যার মাধ্যমে ১২ দিনের এই সংঘাতের অবসান ঘটে।