
মানুষ চিরকালই উচ্চতার প্রতি মোহগ্রস্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার মিটার ওপরে উঠে থাকা তুষারঢাকা পর্বতশৃঙ্গ যেন আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়—“তুমি কি পারবে আমাকে ছুঁতে?” পৃথিবীর উচ্চতম ১০টি পর্বত শুধু ভৌগোলিক বিস্ময় নয়; এগুলো সাহস, সীমা অতিক্রম, প্রযুক্তি, বিশ্বাস আর আত্মত্যাগের জীবন্ত ইতিহাস। এই শৃঙ্গগুলো অবস্থিত মূলত হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালায়, যা নেপাল, ভারত, চীন (তিব্বত) ও পাকিস্তান জুড়ে বিস্তৃত।
৮,০০০ মিটারের ওপরে অঞ্চলকে বলা হয় “ডেথ জোন”—এখানে অক্সিজেনের মাত্রা এত কম যে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে। তবুও প্রতি বছর শত শত অভিযাত্রী এই শৃঙ্গগুলোর দিকে ছুটে যান। কেউ খ্যাতির জন্য, কেউ আত্মজয়ের জন্য, কেউবা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে।
চলুন এবার একে একে জেনে নেওয়া যাক পৃথিবীর উচ্চতম ১০টি পর্বতের বিস্ময়কর গল্প—প্রতিটি শৃঙ্গ যেন এক একটি মহাকাব্য।

পৃথিবীর ছাদ—মাউন্ট এভারেস্ট। নেপালে যার নাম “সাগরমাথা”, তিব্বতে “চোমোলুংমা”—অর্থাৎ “বিশ্বমাতা দেবী”। ১৯৫৩ সালে স্যার এডমুন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের সফল আরোহণ মানব ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করে।
এভারেস্টের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ হলো খুম্বু আইসফল—বরফের চলমান গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিনিয়ত বরফফাটল সৃষ্টি হয়। ৮,০০০ মিটারের ওপরে শুরু হয় ‘ডেথ জোন’, যেখানে অক্সিজেনের ঘাটতিতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্রস্টবাইট, তুষারধস, হঠাৎ ঝড়—সবই এখানে নিত্যসঙ্গী।
বর্তমানে বাণিজ্যিক অভিযানের ফলে এভারেস্টে ভিড় বেড়েছে। কখনও কখনও শীর্ষে ওঠার জন্য লাইনও তৈরি হয়। তবুও, প্রকৃতির সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা এখানে স্পষ্ট—একটি ভুল সিদ্ধান্তই হতে পারে শেষ সিদ্ধান্ত। এভারেস্ট তাই শুধু উচ্চতার নয়, মানসিক শক্তিরও চূড়ান্ত পরীক্ষা।

কে-টু—উচ্চতায় দ্বিতীয়, কিন্তু ভয়ংকরতায় প্রথম বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত এই শৃঙ্গকে বলা হয় “সেভেজ মাউন্টেন”। কারণ এখানে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।
এভারেস্টের তুলনায় কে-টু বেশি খাড়া, বেশি কারিগরি এবং আবহাওয়ার দিক থেকে অনেক বেশি অস্থির। হঠাৎ ঝড়, তুষারধস ও বরফধ্বসের আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। ১৯৫৪ সালে ইতালীয় দল প্রথম এটি জয় করে। কিন্তু মৃত্যুহারের দিক থেকে এটি দীর্ঘদিন শীর্ষে ছিল।
২০২১ সালে প্রথমবারের মতো শীতকালে কে-টু জয় করা সম্ভব হয়—নেপালি পর্বতারোহীদের ঐতিহাসিক সাফল্যে। কে-টু তাই কেবল একটি পর্বত নয়, এটি মানবদৃঢ়তার নির্মম পরীক্ষা।

কাঞ্চনজঙ্ঘা—“তুষারের পাঁচ ভাণ্ডার”—পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। ভারত ও নেপালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই পর্বত স্থানীয়দের কাছে পবিত্র।
১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ দল প্রথম আরোহণ করে, তবে তারা স্থানীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে চূড়ার একেবারে শীর্ষ স্পর্শ করেননি। কাঞ্চনজঙ্ঘার আবহাওয়া অত্যন্ত অস্থির; তুষারধস এখানে বড় ঝুঁকি।
সূর্যোদয়ের সময় এর রঙ বদলে যায়—সাদা থেকে গোলাপি, তারপর সোনালি। এই অপার্থিব সৌন্দর্যই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক শৃঙ্গে পরিণত করেছে।

লোৎসে এভারেস্টের প্রতিবেশী হলেও তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে। এর দক্ষিণ দেয়াল পৃথিবীর অন্যতম খাড়া বরফপ্রাচীর।
১৯৫৬ সালে সুইস দল প্রথম এটি জয় করে। লোৎসের রিজ অত্যন্ত সরু এবং বাতাস প্রবল। সামান্য ভারসাম্যহীনতাও প্রাণঘাতী হতে পারে।
এভারেস্টের সঙ্গে একই বেস ক্যাম্প ভাগ করলেও লোৎসে আলাদা কৌশল দাবি করে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া এখানে টিকে থাকা কঠিন।

মাকালু তার নিখুঁত পিরামিড আকৃতির জন্য বিখ্যাত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশের দিকে ছুটে যাওয়া একটি ধারালো ত্রিভুজ।
১৯৫৫ সালে ফরাসি দল প্রথম আরোহণ সম্পন্ন করে। এর ঢাল অত্যন্ত খাড়া এবং চূড়ার কাছাকাছি অংশ প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। এখানে বাতাস প্রবল এবং আবহাওয়া দ্রুত বদলায়।
মাকালুতে আরোহণ মানে কেবল শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক দৃঢ়তাও প্রয়োজন। ভুল পরিকল্পনা এখানে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।

চো-ওইউ তুলনামূলকভাবে “সহজ” এইট-থাউজেন্ডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সহজ শব্দটি বিভ্রান্তিকর—৮,০০০ মিটারের ওপরে কিছুই সত্যিকারের সহজ নয়।
১৯৫৪ সালে অস্ট্রিয়ান দল প্রথম এটি জয় করে। এর ঢাল তুলনামূলক মসৃণ এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা কম। তাই অনেক নতুন উচ্চপর্বতারোহী প্রথম ৮,০০০ মিটার অভিজ্ঞতার জন্য এটি বেছে নেন।
তবুও, অক্সিজেন স্বল্পতা ও তীব্র ঠান্ডা এখানে সমান ভয়ংকর। চো-ওইউ তাই শিক্ষানবিশদের জন্য এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় বিদ্যালয়।

ধৌলাগিরি অর্থ “শুভ্র পর্বত”—নামটির মতোই এর রূপ অপরূপ। একসময় এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বলে ধারণা করা হতো। ১৯৬০ সালে প্রথম সফল আরোহণ হয়।
ধৌলাগিরির বিশাল বরফপ্রাচীর ও তুষারধসের ঝুঁকি এটিকে বিপজ্জনক করে তোলে। অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম এবং আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তনশীল।
এখানে আরোহণ মানে দীর্ঘ প্রস্তুতি, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং দলগত সমন্বয়। ধৌলাগিরি তার বিশালতা দিয়ে পর্বতারোহীদের বিনয়ী হতে শেখায়।

মানাসলু—অর্থ “আত্মার পর্বত”—নামেই যেন এক গভীরতা আছে। ১৯৫৬ সালে জাপানি দল প্রথম এটি জয় করে।
এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা বেশি, ফলে তুষারধসের আশঙ্কাও প্রবল। এর রুট মাঝারি কারিগরি হলেও দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর।
মানাসলুতে আরোহণ কেবল শারীরিক নয়, মানসিক সহনশীলতারও পরীক্ষা। এর নীরবতা ও বিশালতা মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে।

নাঙ্গা পার্বত—“কিলার মাউন্টেন”—নামের মধ্যেই আছে সতর্কবার্তা। এর রুপাল ফেস পৃথিবীর অন্যতম উঁচু পর্বতপ্রাচীর, প্রায় সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে।
১৯৫৩ সালে হারমান বুল এককভাবে এটি জয় করেন—যা পর্বতারোহণ ইতিহাসের এক কিংবদন্তি অধ্যায়।
এখানে আবহাওয়া হঠাৎ রূপ বদলায়। তুষারধস, বরফঝড়, তীব্র ঠান্ডা—সব মিলিয়ে এটি ভয়ংকর। তবুও এর সৌন্দর্য অপার্থিব, যেন মৃত্যু আর মোহ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

অন্নপূর্ণা-I পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক ৮,০০০ মিটার শৃঙ্গ। ১৯৫০ সালে ফরাসি দল প্রথম সফল আরোহণ সম্পন্ন করে—এটি ছিল প্রথম জয় করা এইট-থাউজেন্ডার।
দীর্ঘদিন মৃত্যুহারের দিক থেকে অন্নপূর্ণা শীর্ষে ছিল। তুষারধস এখানে সবচেয়ে বড় হুমকি। ঢাল খাড়া, রুট জটিল এবং আবহাওয়া অত্যন্ত অস্থির।
অন্নপূর্ণা তাই কেবল উচ্চতার নয়, ঝুঁকির প্রতীক। এখানে আরোহণ মানে প্রকৃতির সঙ্গে এক চূড়ান্ত লড়াই—যেখানে জয় মানেই নতুন ইতিহাস, আর পরাজয় মানেই চিরনিদ্রা।