কেন কিছু তারা সবসময় দেখা যায়, আর কিছু ঋতুর সঙ্গে বদলে যায়?

reasons for stars-800x600
Category : ,

রাতের আকাশ মানুষের কৌতূহল জাগানোর অন্যতম প্রাচীন উৎস। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে তারার অবস্থান লক্ষ্য করেছে, তাদের নিয়ে গল্প তৈরি করেছে এবং নক্ষত্রমণ্ডলীর নামকরণ করেছে। কিন্তু যারা নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন, তারা খুব সহজেই একটি বিষয় খেয়াল করেন—কিছু তারা বা নক্ষত্রমণ্ডলী প্রায় সারা বছরই দেখা যায়, আবার কিছু তারা নির্দিষ্ট ঋতুতেই দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, শীতকালে আকাশে খুব সহজেই দেখা যায় বিখ্যাত ওরিয়ন (Orion) নক্ষত্রমণ্ডলী, কিন্তু গ্রীষ্মের রাতে এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে বিগ ডিপার (Big Dipper) বা উরসা মেজরের অংশবিশেষ প্রায় সারা বছরই দেখা যায়।

এই রহস্যের পেছনে রয়েছে পৃথিবীর ঘূর্ণন, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবর্তন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সময় মাপার বিশেষ পদ্ধতি। পৃথিবী প্রতিদিন নিজ অক্ষের উপর ঘোরে এবং একই সঙ্গে সূর্যকে কেন্দ্র করে বছরে একবার ঘুরে আসে। এই দুই ধরনের গতির কারণে তারাগুলোর অবস্থান আমাদের কাছে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলে কোনো নক্ষত্রমণ্ডলী এক সময় আকাশে দেখা গেলেও কয়েক মাস পরে সেটি আর রাতের আকাশে দৃশ্যমান থাকে না।

এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব—কেন কিছু তারা সবসময় দেখা যায়, কেন কিছু তারা ঋতুর সঙ্গে বদলে যায়, এবং এই রহস্যের পেছনে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কী কী মৌলিক ধারণা কাজ করে।


১. সাইডেরিয়াল সময়: তারার সময়ের হিসাব

Image

আমরা সাধারণত একটি দিনকে ২৪ ঘণ্টা হিসেবে জানি। এটি আসলে সোলার ডে (Solar Day)—অর্থাৎ সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী এক দুপুর থেকে পরের দুপুর পর্যন্ত সময়। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আরেক ধরনের দিনের হিসাব ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় সাইডেরিয়াল ডে (Sidereal Day)

সাইডেরিয়াল ডে হলো পৃথিবীর এমন একটি পূর্ণ ঘূর্ণন, যা দূরের তারাদের তুলনায় মাপা হয়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। অর্থাৎ সূর্যভিত্তিক দিনের তুলনায় এটি প্রায় ৪ মিনিট কম

এই ছোট পার্থক্যের ফলেই আমরা রাতের আকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখতে পাই। প্রতিদিন একই সময়ে আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারাগুলো আগের দিনের তুলনায় সামান্য পশ্চিমে সরে গেছে। কারণ তারা বাস্তবে সরে যায় না; বরং পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের কারণে আমাদের দৃষ্টিকোণ বদলে যায়।

এই ৪ মিনিটের পার্থক্য জমতে জমতে এক মাসে প্রায় ২ ঘণ্টা হয়ে যায়। ফলে যে নক্ষত্রমণ্ডলী একটি নির্দিষ্ট সময়ে দিগন্তের কাছে দেখা যাচ্ছিল, কয়েক সপ্তাহ পরে সেটি আকাশের অনেক ওপরে উঠে যায়। এ কারণেই শীতকালে সন্ধ্যার সময় দেখা যায় এমন অনেক নক্ষত্রমণ্ডলী কয়েক মাস পরে রাতের অন্য সময়ে দেখা যায় অথবা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।


২. ঋতুর সঙ্গে নক্ষত্রমণ্ডলীর পরিবর্তন

Image

রাতের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো পৃথিবীর সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তন। পৃথিবী যখন এক বছরে সূর্যের চারদিকে একবার ঘোরে, তখন বছরের বিভিন্ন সময়ে আমরা মহাকাশের বিভিন্ন দিকে তাকাই। ফলে আকাশে দৃশ্যমান নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থানও বদলে যায়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলী। এটি তিনটি উজ্জ্বল তারার একটি সরল রেখা—যাকে বলা হয় Orion’s Belt—দিয়ে খুব সহজে চেনা যায়। উত্তর গোলার্ধে শীতকালে সন্ধ্যার পর আকাশে এটি খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ডিসেম্বরের দিকে এটি দিগন্তের কাছাকাছি থাকে, আর ফেব্রুয়ারি বা মার্চে এটি আকাশের প্রায় মাঝখানে উঠে আসে।

কিন্তু গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যায় ওরিয়ন দেখা যায় না। কারণ তখন সূর্য আকাশের সেই দিকেই থাকে, যেদিকে ওরিয়ন অবস্থিত। সূর্যের আলোয় আকাশ উজ্জ্বল থাকায় তারাগুলো দেখা যায় না। তবে খুব ভোরে, সূর্য ওঠার আগে পূর্ব আকাশে তাকালে তখনও ওরিয়ন দেখা সম্ভব।

অর্থাৎ নক্ষত্রমণ্ডলী অদৃশ্য হয়ে যায় না; বরং পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান বদলানোর কারণে আমরা ভিন্ন সময়ে ভিন্ন নক্ষত্রমণ্ডলী দেখতে পাই। এই কারণেই আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীর একটি ঋতুভিত্তিক চক্র রয়েছে।


৩. সার্কাম্পোলার তারা: যে তারা কখনো অস্ত যায় না

Image

কিছু তারা বা নক্ষত্রমণ্ডলী রয়েছে যেগুলো প্রায় সারা বছরই দেখা যায়। এদের বলা হয় সার্কাম্পোলার স্টার (Circumpolar Stars)। উত্তর গোলার্ধে এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো বিগ ডিপার, যা উরসা মেজর নক্ষত্রমণ্ডলীর একটি অংশ।

এই ঘটনার পেছনে রয়েছে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ। পৃথিবীর উত্তর মেরুর দিক আকাশে যে বিন্দুর দিকে নির্দেশ করে, তাকে বলা হয় নর্থ সেলেস্টিয়াল পোল। বর্তমানে এই বিন্দুর খুব কাছাকাছি রয়েছে বিখ্যাত তারা পোলারিস (Polaris) বা উত্তর তারা।

পোলারিসের কাছাকাছি থাকা তারাগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের সময় আকাশে একটি বৃত্তের মতো ঘুরতে থাকে। তারা কখনো পুরোপুরি দিগন্তের নিচে নামে না। ফলে সেগুলো আমাদের কাছে সবসময় দৃশ্যমান থাকে।

আপনি যদি উত্তর গোলার্ধে থাকেন—যেমন বাংলাদেশে—তাহলে বিগ ডিপারকে বছরের প্রায় সব সময়েই আকাশে দেখা যায়। তবে এর অবস্থান ঘড়ির কাঁটার মতো ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে।

পৃথিবীর বিষুবরেখার কাছাকাছি গেলে সার্কাম্পোলার তারার সংখ্যা কমে যায়। আর ঠিক বিষুবরেখায় দাঁড়ালে কোনো তারাই সার্কাম্পোলার থাকে না—সব তারা পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়।


৪. পৃথিবীর অক্ষের প্রিসেশন: হাজার বছরের পরিবর্তন

Image

রাতের আকাশের পরিবর্তন শুধু দিন বা বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে আরও বড় পরিবর্তন ঘটে। এর প্রধান কারণ হলো পৃথিবীর অক্ষের প্রিসেশন (Axial Precession)

একটি ঘূর্ণায়মান লাটিমের কথা ভাবুন। লাটিম ঘুরতে ঘুরতে তার অক্ষ একটু একটু করে দুলতে থাকে। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটে। সূর্য ও বৃহস্পতি গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ ধীরে ধীরে একটি বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে।

এই পুরো চক্র সম্পূর্ণ হতে প্রায় ২৬,০০০ বছর সময় লাগে। এর ফলে সময়ের সাথে সাথে আকাশে উত্তর মেরুর দিকও বদলে যায়।

বর্তমানে পোলারিস আমাদের উত্তর তারকা। কিন্তু প্রায় ১২,০০০ বছর পরে উজ্জ্বল তারা ভেগা (Vega) উত্তর মেরুর সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসবে এবং তখন সেটিই হবে নতুন উত্তর তারকা।

এই প্রিসেশনের কারণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে—রাশিচক্রের নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থানও ধীরে ধীরে সরে যায়। হাজার হাজার বছর আগে জ্যোতিষশাস্ত্রে যে সময়গুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল, আজকের দিনে সূর্য সেই একই নক্ষত্রমণ্ডলীতে ঠিক সেই সময় অবস্থান করে না।

অর্থাৎ রাতের আকাশ শুধু প্রতিদিন বা প্রতি ঋতুতেই নয়, হাজার বছরের সময়সীমাতেও ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।

crossmenu