পৃথিবীর উষ্ণতম ১০টি স্থান

top 10 warmest place on the earth-1200x800
Category : ,

পৃথিবী এমন একটি গ্রহ যেখানে জলবায়ুর বৈচিত্র্য অসাধারণ। কোথাও বরফে ঢাকা তুষারময় মেরু অঞ্চল, আবার কোথাও আগুনের মতো উত্তপ্ত মরুভূমি। পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যা মানুষের পক্ষে সহ্য করা অত্যন্ত কঠিন। এসব অঞ্চল সাধারণত মরুভূমি বা শুষ্ক ভূমি, যেখানে বৃষ্টিপাত খুব কম এবং সূর্যের তীব্র তাপ সরাসরি ভূমিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন আবহাওয়া কেন্দ্র, স্যাটেলাইট তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করেছেন। এসব অঞ্চলে কখনও কখনও তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হয়ে যায়। শুধু বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ভূমির তাপমাত্রা ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে দেখা গেছে।

এই চরম উষ্ণ পরিবেশ শুধু মানুষের জন্যই নয়, জীববৈচিত্র্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো—কিছু অঞ্চলে মানুষ এখনও বসবাস করছে এবং কঠিন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পৃথিবীর উষ্ণতম এসব স্থান আমাদেরকে জলবায়ুর চরম বৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির শক্তির একটি বিস্ময়কর চিত্র দেখায়।

এই ব্লগে আমরা পৃথিবীর উষ্ণতম ১০টি স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানব, যেখানে তাপমাত্রা প্রায়ই পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।


১. ডেথ ভ্যালি, যুক্তরাষ্ট্র

Image

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ডেথ ভ্যালি পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই ফার্নেস ক্রিক এলাকায় ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা এখনো পৃথিবীর সর্বোচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা হিসেবে স্বীকৃত।

ডেথ ভ্যালি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৬ মিটার নিচে অবস্থিত একটি বিশাল মরুভূমি উপত্যকা। চারপাশের উঁচু পাহাড় গরম বাতাসকে আটকে রাখে, ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখানে তাপমাত্রা এত বেশি হয়।

গ্রীষ্মকালে দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তীব্র গরমের কারণে এখানে পানি দ্রুত বাষ্প হয়ে যায় এবং পরিবেশ অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে ওঠে। তবে এত প্রতিকূল পরিবেশেও কিছু বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী এখানে টিকে আছে।

বর্তমানে ডেথ ভ্যালি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ মরুভূমির অভিজ্ঞতা নিতে এখানে আসেন। তবে গ্রীষ্মকালে এই এলাকায় ভ্রমণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়।


২. দাশত-ই লুত মরুভূমি, ইরান

Image

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত দাশত-ই লুত মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। নাসার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এখানে ভূমির তাপমাত্রা একাধিকবার ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভূমি তাপমাত্রাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

এই মরুভূমি প্রায় ৫১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে বিশাল বালিয়াড়ি, পাথুরে সমভূমি এবং “কালুত” নামে পরিচিত অদ্ভুত আকৃতির পাথরের গঠন দেখা যায়। সূর্যের তীব্র তাপ ও কালো পাথরের কারণে ভূমি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

দাশত-ই লুত এতটাই প্রতিকূল যে এই মরুভূমির অনেক অংশে প্রায় কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম হওয়ায় এখানে উদ্ভিদ জন্মানোর সুযোগও খুব সীমিত।

তবুও এই মরুভূমি ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অনন্য ভূপ্রকৃতি ও চরম তাপমাত্রা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে।


৩. দাল্লোল, ইথিওপিয়া

Image

ইথিওপিয়ার দানাকিল ডিপ্রেশন অঞ্চলে অবস্থিত দাল্লোল পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ বসতিপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানে সারা বছরের গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা পৃথিবীর বসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা।

দাল্লোল এলাকা তার অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্যও বিখ্যাত। এখানে গরম পানির উষ্ণ প্রস্রবণ, সালফার, লবণ এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মিলে তৈরি করেছে রঙিন ও অদ্ভুত ভূদৃশ্য। হলুদ, কমলা ও সবুজ রঙের খনিজ স্তর এই অঞ্চলকে পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গা থেকে আলাদা করে তুলেছে।

এই অঞ্চলে মূলত আফার জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। তারা প্রধানত লবণ খনির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রচণ্ড তাপ এবং কঠিন পরিবেশের মধ্যেও তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে বসবাস করছে।

দাল্লোলকে অনেক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল বসবাসযোগ্য স্থান বলা হয়। তীব্র তাপ, বিষাক্ত গ্যাস এবং অত্যন্ত শুষ্ক পরিবেশ এখানে জীবনযাপনকে কঠিন করে তোলে।


৪. কেবিলি, তিউনিসিয়া

Image

তিউনিসিয়ার সাহারা মরুভূমির কাছাকাছি অবস্থিত কেবিলি উত্তর আফ্রিকার অন্যতম উষ্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। ১৯৩১ সালে এখানে প্রায় ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার অন্যতম সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে বিবেচিত ছিল।

কেবিলি মূলত একটি মরূদ্যান শহর। মরুভূমির মাঝখানে অবস্থিত এই শহরে খেজুর গাছ এবং ছোট ছোট বসতি দেখা যায়। ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের কারণে এখানে কিছু কৃষিকাজ সম্ভব হয়েছে।

তবে গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়। দিনের বেলা সূর্যের তাপ এতটাই তীব্র হয় যে বাইরে দীর্ঘ সময় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টিপাত খুব কম হওয়ায় পরিবেশ অত্যন্ত শুষ্ক।

তবুও কেবিলি অঞ্চলে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে এবং মরুভূমির কঠিন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।


৫. তিরাত জেভি, ইসরায়েল

Image

ইসরায়েলের জর্ডান ভ্যালিতে অবস্থিত তিরাত জেভি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম উষ্ণ অঞ্চল। ১৯৪২ সালে এখানে প্রায় ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত হওয়ায় এখানে তাপমাত্রা বেশি থাকে। নিচু উপত্যকায় গরম বাতাস আটকে যায় এবং বাতাসের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে।

তিরাত জেভি মূলত একটি কৃষিভিত্তিক বসতি। আধুনিক সেচব্যবস্থা ব্যবহার করে এখানে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও মানুষ কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা এই এলাকাকে পৃথিবীর উষ্ণতম বসতিগুলোর মধ্যে একটি করে তুলেছে।


৬. মিত্রিবা, কুয়েত

Image

কুয়েতের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত মিত্রিবা পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এখানে ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

এই অঞ্চলটি মূলত শুষ্ক মরুভূমি, যেখানে গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপ অত্যন্ত তীব্র হয়। দিনের বেলায় বাতাসও খুব গরম থাকে এবং আর্দ্রতা খুবই কম থাকে।

মিত্রিবা এলাকায় মানুষের বসতি খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে তাপমাত্রা এবং জলবায়ুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি অঞ্চলে তাপপ্রবাহ খুবই সাধারণ ঘটনা। গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।


৭. তুরবাত, পাকিস্তান

Image

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত তুরবাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উষ্ণ শহর। ২০১৭ সালের মে মাসে এখানে ৫৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

তুরবাত একটি শুষ্ক ও মরুপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত শহর। এখানে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ দেখা যায়। দিনের বেলায় তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক সময় মানুষকে ঘরের ভিতরেই থাকতে হয়।

তবে এই শহরটি কৃষি ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আশেপাশের অঞ্চলে খেজুরসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়।

চরম তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও তুরবাতের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ এখানে বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।


৮. আহওয়াজ, ইরান

Image

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত আহওয়াজ শহর পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ নগরী। এখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।

আহওয়াজ কারুন নদীর তীরে অবস্থিত একটি বড় শিল্পনগরী। তেল শিল্প এবং বাণিজ্যের জন্য এই শহর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই শহরটি শুধু গরমের জন্যই নয়, দূষণের জন্যও পরিচিত। ধুলাবালি ও মরুভূমির বাতাসের কারণে এখানে বাতাসের মান অনেক সময় খারাপ হয়ে যায়।

গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরমের কারণে এখানে মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষ এই কঠিন পরিবেশে বসবাস করে যাচ্ছে।


৯. উডনাডাটা, অস্ট্রেলিয়া

Image

অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের আউটব্যাক অঞ্চলে অবস্থিত উডনাডাটা একটি ছোট মরু শহর। ১৯৬০ সালে এখানে ৫০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

এই অঞ্চলটি অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চলের অংশ। এখানে বৃষ্টিপাত খুব কম এবং গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়।

উডনাডাটা ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড রুট ছিল, যাকে “উডনাডাটা ট্র্যাক” বলা হয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় স্থান।

চরম গরম থাকা সত্ত্বেও এখানে ছোট একটি সম্প্রদায় বসবাস করে এবং মরুভূমির কঠিন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।


১০. আজিজিয়া, লিবিয়া

Image

লিবিয়ার আজিজিয়া শহর একসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডধারী স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯২২ সালে এখানে ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

তবে পরে আবহাওয়াবিদরা এই রেকর্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায় যে পরিমাপের পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে। পরে এই রেকর্ডটি বাতিল করা হয়।

তবুও আজিজিয়া সাহারা মরুভূমির কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

এই অঞ্চলটি মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এখানে বালুঝড়ও বেশ সাধারণ। চরম পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও মানুষ এখানে বসবাস করে এবং মরুভূমির জীবনধারার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।

crossmenu