মহাকাশ প্রতিযোগিতা আবারও ফিরে এসেছে—তবে এবার সেটি আগের মতো সরাসরি “স্পেস রেস” নয়, বরং প্রযুক্তি, কৌশল ও ভবিষ্যৎ দখলের লড়াই। একদিকে NASA তাদের Artemis II মিশনের মাধ্যমে চাঁদের পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছে, অন্যদিকে চীনও চুপচাপ নয়—তারা ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদের মাটিতে নামানোর পরিকল্পনা করছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—চীন কি যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর ইতিহাস গড়তে পারবে?
চীনের পরিকল্পনা: “স্বপ্নযান” থেকে চাঁদের পথে
চীনের মহাকাশ সংস্থা China Manned Spaceflight Agency ইতিমধ্যেই তাদের চন্দ্র অভিযানের রূপরেখা প্রকাশ করেছে।
এই মিশনে ব্যবহৃত হবে দুটি প্রধান প্রযুক্তি—
Mengzhou spacecraft
- অর্থ: “স্বপ্নযান”
- এটি নভোচারীদের বহন করবে
- সর্বোচ্চ ৭ জনকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিতে পারলেও
- চাঁদের মিশনে যাবে প্রায় ৩ জন
Long March 10
- নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী রকেট
- Mengzhou-কে চাঁদের কক্ষপথে পাঠাবে
Lanyue lunar lander
- অর্থ: “চাঁদকে আলিঙ্গন”
- আলাদা রকেটে যাবে
- পরে কক্ষপথে গিয়ে Mengzhou-এর সাথে যুক্ত হবে
এই পদ্ধতি অনেকটা Orion spacecraft ব্যবহৃত মার্কিন কৌশলের মতো।
পরীক্ষামূলক অগ্রগতি: চীন কতটা প্রস্তুত?
২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী—
- Mengzhou-এর প্রথম টেস্ট ফ্লাইট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে
- এতে জরুরি “abort system” পরীক্ষাও করা হয়েছে
- খুব শিগগিরই এটি Tiangong space station-এ একটি টেস্ট মিশনে যাবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের প্রযুক্তি “প্রায় প্রস্তুত” অবস্থায় রয়েছে।
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: বিলম্বের চাপ
NASA প্রথমে ২০২৪ সালে চাঁদে মানুষ নামানোর পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু—
- ল্যান্ডার (Starship / Blue Moon) এখনও প্রস্তুত নয়
- ফলে সময়সীমা পিছিয়ে গিয়ে ২০২৮ বা তারও পরে যেতে পারে
এই বিলম্বই চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
কোথায় নামবে চীন?
চীন তাদের প্রথম চন্দ্র অবতরণের জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য স্থান বিবেচনা করছে—
Rimae Bode
- চাঁদের বিষুবরেখার কাছে
- তুলনামূলক সমতল ও নিরাপদ
- বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বিজ্ঞানীরা মনে করেন—
- এখানে চাঁদের গভীর স্তরের উপাদান পাওয়া যেতে পারে
- চাঁদ ও পৃথিবীর উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: চাঁদের দক্ষিণ মেরু
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই শেষ পর্যন্ত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যেতে চায়।
কারণ—
- সেখানে বরফ (water ice) থাকার সম্ভাবনা
- যা ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা যাবে
- অর্থাৎ ভবিষ্যতের রকেট জ্বালানি
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি: কার লক্ষ্য কী?
চীন ও রাশিয়া মিলে একটি বড় পরিকল্পনা করেছে—
International Lunar Research Station
- ২০৩০-এর দশকে স্থায়ী ঘাঁটি
- গবেষণা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও খনিজ অনুসন্ধান
অন্যদিকে, NASA-ও চাঁদে বেস তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এটি কি নতুন “স্পেস রেস”?
অনেকেই এটিকে নতুন “স্পেস রেস” বললেও বাস্তবতা একটু ভিন্ন।
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি:
- চীনকে হারিয়ে আগে পৌঁছাতে চায়
- রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ রয়েছে
🇨🇳 চীনের দৃষ্টিভঙ্গি:
- তারা প্রতিযোগিতার চেয়ে “স্থায়ী উপস্থিতি”তে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে
- চাঁদকে তারা “strategic high ground” হিসেবে দেখে
একজন বিশেষজ্ঞের মতে:
“যুক্তরাষ্ট্রই আসলে চীনের সাথে দৌড়াচ্ছে, উল্টোটা নয়।”
চীনের আগের সাফল্য
চীন ইতিমধ্যেই চাঁদে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে—
- ২০১৯ → চাঁদের অদৃশ্য পাশে অবতরণ
- ২০২০ → চাঁদের নমুনা সংগ্রহ
- ২০২৪ → far side থেকে নমুনা সংগ্রহ
এসবই তাদের ভবিষ্যৎ মানব মিশনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
তাহলে কে আগে পৌঁছাবে?
এটি এখনো অনিশ্চিত, তবে—
- চীন সময়সীমা মেনে চলতে পারার জন্য পরিচিত
- যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত বিলম্বে ভুগছে
তাই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন— চীন ২০৩০ সালের আগেই চাঁদে মানুষ নামাতে পারে।
চাঁদ এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়—
এটি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং মহাকাশ আধিপত্যের প্রতীক।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই তাদের নিজস্ব পথে এগোচ্ছে।
কেউ দৌড়ে জিততে চায়, কেউ দীর্ঘমেয়াদে জায়গা দখল করতে চায়।
শেষ পর্যন্ত হয়তো প্রশ্নটা “কে আগে পৌঁছাবে” নয়— বরং “কে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে”।