ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা। প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসরে অংশ নেওয়া অনেক দেশের জন্যই একটি স্বপ্ন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বের কয়েকটি অত্যন্ত জনবহুল দেশ এখনো পর্যন্ত কখনোই ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়নি।
জনসংখ্যার বিচারে এসব দেশের অনেকগুলোই বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। বিপুল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও ফুটবল অবকাঠামো, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতামূলক লিগ কিংবা আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে পৌঁছাতে পারেনি।
নিচে এমন ১০টি দেশের তালিকা তুলে ধরা হলো, যারা জনসংখ্যার দিক থেকে বিশাল হলেও এখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
১. ভারত — ১৪৭ কোটি
ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। প্রায় ১৪৭ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ফুটবলের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) ফুটবলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তবুও ভারত এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ভারতের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল, কিন্তু দলটি শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি।
২. ইন্দোনেশিয়া — ২৮ কোটি ৮০ লাখ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়া ফুটবলপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। দেশটির লিগ এবং সমর্থকগোষ্ঠী অত্যন্ত প্রাণবন্ত। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার কারণে তারা এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি।
৩. পাকিস্তান — ২৫ কোটি ৯০ লাখ
পাকিস্তানে ক্রিকেটের আধিপত্য ফুটবলের বিকাশকে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত রেখেছে। দেশটির ফুটবল প্রশাসনে নানা সমস্যা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অনিয়মিত অংশগ্রহণের কারণে বিশ্বকাপে ওঠার স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
৪. বাংলাদেশ — ১৭ কোটি ৭৮ লাখ
বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অত্যন্ত বেশি। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল উন্মাদনা চোখে পড়ে। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে জাতীয় দলের সাফল্যের ফারাক এখনো অনেক। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক দল গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
৫. ইথিওপিয়া — ১৩ কোটি ৯০ লাখ
আফ্রিকার অন্যতম জনবহুল দেশ ইথিওপিয়া। একসময় আফ্রিকান ফুটবলে দেশটির উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, কিন্তু আধুনিক যুগে তারা মহাদেশীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি।
৬. ফিলিপাইন — ১১ কোটি ৮০ লাখ
ফিলিপাইনে বাস্কেটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। বিদেশে বেড়ে ওঠা ফিলিপিনো বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গঠন করে দেশটি উন্নতির চেষ্টা করছে। তবুও বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠার লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি।
৭. ভিয়েতনাম — ১০ কোটি ২০ লাখ
ভিয়েতনাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল ফুটবল শক্তি। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তাদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য এবং জাতীয় দলও সাম্প্রতিক সময়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আগামী বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ভিয়েতনামেরই।
৮. থাইল্যান্ড — ৭ কোটি ২০ লাখ
থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল হিসেবে পরিচিত। তবে এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণে তারা এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি।
৯. তানজানিয়া — ৭ কোটি ১০ লাখ
তানজানিয়ায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে। দেশটির স্থানীয় লিগ এবং জাতীয় দল উন্নতির পথে থাকলেও আফ্রিকার শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিশ্বকাপে ওঠা এখনো কঠিন চ্যালেঞ্জ।
১০. কেনিয়া — ৫ কোটি ৮০ লাখ
কেনিয়া সাধারণত অ্যাথলেটিক্সে বিশ্বজুড়ে বেশি পরিচিত। ফুটবলেও দেশটির সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতামূলক মানের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এখনো বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটাতে পারেনি।
কেন জনসংখ্যা সবসময় সাফল্য নিশ্চিত করে না?
অনেকেই মনে করেন, জনসংখ্যা বেশি মানেই প্রতিভার ভাণ্ডার বেশি। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। বিশ্বকাপে সফল হতে প্রয়োজন—
- শক্তিশালী ফুটবল অবকাঠামো
- উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা
- বয়সভিত্তিক একাডেমি
- প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লিগ
- দক্ষ কোচিং কাঠামো
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ
এই কারণেই তুলনামূলকভাবে ছোট জনসংখ্যার দেশ যেমন ক্রোয়েশিয়া, উরুগুয়ে বা আইসল্যান্ড আন্তর্জাতিক ফুটবলে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি এখনো ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি, যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তবে ফুটবল দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি খেলা। ভিয়েতনাম, ভারত, বাংলাদেশ কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো অবকাঠামো ও যুব উন্নয়নে সঠিক বিনিয়োগ অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতের কোনো এক বিশ্বকাপে তাদের অভিষেক দেখা যেতে পারে।
জনসংখ্যা একটি বড় সম্পদ হলেও বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ফুটবল উন্নয়ন, ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ। তাই আগামী দশকগুলোতে এই তালিকার কিছু দেশের নাম হয়তো আর এখানে দেখা যাবে না।