আজকের মেরুকৃত বিশ্বে কোন দেশ বিশ্বমঞ্চে কতটা জনপ্রিয় আর কাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে, তা কেবল কূটনীতির টেবিল দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের মতামত এখানে বড় ভূমিকা রাখে। 'অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্রেসিস ফাউন্ডেশন' এবং 'নীরা ডেটা'র যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬-এ উঠে এসেছে এমনই কিছু চমকপ্রদ ও বিষ্ফোরক তথ্য।
নেট পারসেপশন স্কোরের (ইতিবাচক মতামত থেকে নেতিবাচক মতামতের বিয়োগফল) ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে কম পছন্দের ১০টি দেশের তালিকা এবং এর পেছনের ভূ-রাজনীতি নিয়ে আজকের এই বিশদ আলোচনা।
কম পছন্দের তালিকায় শীর্ষ ১০টি দেশ ও তাদের স্কোর
জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় যে দেশগুলোকে, তাদের তালিকাটি নিচে দেওয়া হলো (স্কোর যত কম, নেতিবাচকতা তত বেশি):
| অবস্থান | দেশ | নেট পারসেপশন স্কোর |
| ১ | 🇮🇱 ইসরাইল | -২৪ |
| ২ | 🇰🇵 উত্তর কোরিয়া | -১৯ |
| ৩ | 🇦🇫 আফগানিস্তান | -১৯ |
| ৪ | 🇮🇷 ইরান | -১৭ |
| ৫ | 🇺🇸 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | -১৬ |
| ৬ | 🇮🇶 ইরাক | -১৩ |
| ৭ | 🇷🇺 রাশিয়া | -১১ |
| ৮ | 🇸🇾 সিরিয়া | -১০ |
| ৯ | 🇵🇰 পাকিস্তান | -৯ |
| ১০ | 🇧🇾 বেলারুশ | -৫ |
মূল বিশ্লেষণ: কেন এই দেশগুলো বৈশ্বিক জনমতের তলানিতে?
এই তালিকার দিকে তাকালে কয়েকটি স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক কারণ এবং সংঘাতের চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। নিচে প্রধান কয়েকটি দেশের নেতিবাচক স্কোরের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ইসরাইল (-২৪): তালিকার সবচেয়ে নিচে
২০২৬ সালের জরিপে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে কম পছন্দের দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ইসরাইল। এর প্রধান কারণ গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ায় চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত ও মানবিক সংকট। বৈশ্বিক জনমতের একটি বিশাল অংশ এই সংঘাতের কারণে ইসরাইলের প্রতি তীব্র নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে, যা তাদের স্কোরকে সর্বনিম্নে (-২৪) নামিয়ে এনেছে।
২. উত্তর কোরিয়া (-১৯) ও আফগানিস্তান (-১৯)
- উত্তর কোরিয়া: দেশটির পরমাণু কর্মসূচির হুমকি, একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার নীতির কারণে দীর্ঘকাল ধরেই বৈশ্বিক জনমতে দেশটির ভাবমূর্তি অত্যন্ত ক্ষুণ্ন।
- আফগানিস্তান: তালেবান শাসনভার গ্রহণের পর মানবাধিকার, বিশেষ করে নারী অধিকার ও স্বাধীনতার চরম সংকোচন এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আফগানিস্তান নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব অপরিবর্তিত রয়েছে।
৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (-১৬): জরিপের সবচেয়ে বড় চমক
এই জরিপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (US) ভাবমূর্তির এক অভাবনীয় ধস। ২০২৪ সালেও যেখানে আমেরিকার নেট পজিটিভ স্কোর ছিল +২২, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে -১৬-তে।
- পতনের কারণ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোতে ওয়াশিংটনের নীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে আমেরিকার অবস্থানকে বিশ্বের বহু দেশের মানুষ নেতিবাচকভাবে দেখছে।
- রাশিয়া ও চীনের চেয়েও নিচে: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই জরিপে আমেরিকার ভাবমূর্তি রাশিয়ার (-১১) চেয়েও নিচে নেমে গেছে। এমনকি ইউরোপের একটি বড় অংশ এখন আমেরিকার চেয়ে চীনকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক চোখে দেখছে।
৪. ইরান (-১৭), ইরাক (-১৩) ও সিরিয়া (-১০)
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সাথে পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধগুলোর প্রভাব তাদের এই নেতিবাচক স্কোরের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
৫. রাশিয়া (-১১) ও বেলারুশ (-৫)
ইউক্রেন সংকটের কারণে পশ্চিমা বিশ্বে রাশিয়ার প্রতি তীব্র ক্ষোভ থাকলেও, এশিয়া-প্যাসিফিক বা গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল দেশসমূহ) অনেক দেশে রাশিয়ার প্রতি সমর্থন রয়েছে। ফলে আমেরিকার মতো বড় ধস না হয়ে রাশিয়ার স্কোর -১১ তে স্থিতিশীল রয়েছে। আর রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বেলারুশও এই নেতিবাচকতার অংশীদার হয়েছে।
শেষ কথা
২০২৬ সালের ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স আমাদের দেখায় যে, বিশ্ব এখন আর একক কোনো পরাশক্তির অধীনে নেই (Global Dealignment)। মানুষ এখন পশ্চিমা বা পুঁজিপতি দেশগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে সহজভাবে নিচ্ছে না। আমেরিকার মতো দেশের পপুলারিটি ধস এবং ইসরাইলের ওপর বৈশ্বিক ক্ষোভ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের পক্ষে আরও বেশি সোচ্চার।
আপনার কি মনে হয়? এই তালিকায় আমেরিকার এমন পতন কি বিশ্বরাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? কমেন্ট সেকশনে আপনার মতামত জানান!