মোঃ মাহবুবুল আলমের লেখা ‘হুমায়ূন আহমেদের সাথে সাতটি বছর’ মূলত কোনো সাধারণ জীবনীগ্রন্থ নয়। এটি স্মৃতি, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এক এমন মিশ্রণ, যেখানে হুমায়ূন আহমেদ ধরা দেন দূরবর্তী কোনো সাহিত্যিক প্রতিমা হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের খুব কাছের, কখনও রহস্যময়, আবার কখনও অতি সাধারণ এক মানুষ হিসেবে।
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আন্তরিকতা। লেখক নিজে হুমায়ূন আহমেদের সান্নিধ্যে সাত বছর ছিলেন—এই সময়টুকু তিনি শুধু পর্যবেক্ষণ করেননি, বরং অনুভব করেছেন। ফলে বইটি তথ্যনির্ভর জীবনী হওয়ার বদলে হয়ে উঠেছে এক ধরনের “লাইভ অভিজ্ঞতার ডায়েরি”, যেখানে প্রতিটি ঘটনা ব্যক্তিগত স্পর্শে উজ্জ্বল।
হুমায়ূন আহমেদের মানবিক রূপ
বইটি পাঠ করতে করতে পাঠকের সামনে ধীরে ধীরে যে হুমায়ূন আহমেদ উঠে আসেন, তিনি “জনপ্রিয় লেখক” পরিচয়ের বাইরের একজন মানুষ। কখনও তিনি নিরাসক্ত ভঙ্গিতে রসিকতা করেন, কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে গভীর কোনো মন্তব্য ছুড়ে দেন, আবার কখনও একেবারে সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যে হারিয়ে যান।
এই দিকটি বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। লেখক যেভাবে ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মানসিক জগৎকে ধরার চেষ্টা করেছেন, তা অনেক সময় জীবনীমূলক বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি জীবন্ত মনে হয়। বিশেষ করে তাঁর নীরবতা, সিদ্ধান্তহীনতা, আবার একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার বিস্ফোরণ—সবকিছুই এক ধরনের দ্বৈত চরিত্র তৈরি করে।
সাহিত্যিক পরিবেশ ও সময়ের চিত্র
বইটি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি সময়কেও ধরে রাখে। হুমায়ূন আহমেদের আশেপাশের লেখক, সহকর্মী, নাট্যপরিবেশ, সাংবাদিকতা—সব মিলিয়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এখানে ধরা পড়ে। ফলে পাঠক কেবল একজন লেখকের জীবন নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও টেলিভিশন নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ও অনুভব করতে পারেন।
এখানে লেখকের ভাষা খুব বেশি অলংকারপূর্ণ নয়, বরং সহজ ও কথোপকথনধর্মী। এই সহজতা বইটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
শক্তিশালী দিক
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের সততা। লেখক কোনো “বড় লেখককে মহিমান্বিত করার” চেষ্টা করেননি, আবার অযথা সমালোচনাও করেননি। বরং তিনি যা দেখেছেন, যেমন দেখেছেন, তেমনভাবেই তুলে ধরেছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আহসান হাবীবের ভূমিকাটি, যেখানে বইটির লেখনশৈলীর মধ্যে থাকা হিউমার এবং পর্যবেক্ষণশক্তির প্রশংসা করা হয়েছে। এই বিষয়টি বইটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করে।
শেষ কথা
‘হুমায়ূন আহমেদের সাথে সাতটি বছর’ আসলে হুমায়ূন আহমেদকে বোঝার চেয়ে বেশি অনুভব করার বই। এটি পাঠককে একজন লেখকের দৈনন্দিন জীবন, তার নীরবতা, তার হাসি, তার অদ্ভুত আচরণ এবং তার সৃষ্টিশীল জগতের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়।
যারা হুমায়ূন আহমেদকে কেবল তাঁর গল্প বা নাটকের মাধ্যমে জানেন, তাদের জন্য এই বইটি এক ভিন্ন দরজা খুলে দেয়—যেখানে তিনি শুধু কিংবদন্তি নন, বরং একজন জীবন্ত মানুষ, যার চারপাশে থাকা মানুষগুলোই তার গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিমূলক গ্রন্থ, যা বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য হুমায়ূন আহমেদকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে।