ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানা পাটেকার এমন একজন অভিনেতা, যিনি কখনো ভয়ংকর খলনায়ক, কখনো প্রতিবাদী নায়ক, কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেছেন। তাঁর অভিনয়ের শক্তি শুধু সংলাপের তীব্রতায় নয়, বরং চরিত্রের আবেগ ও মানসিক জটিলতা ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতায়।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে তিনি হিন্দি, মারাঠি ও অন্যান্য ভাষার বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘পারিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘প্রহার’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’ ও ‘নাটসম্রাট’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে।
1. পারিন্দা (Parinda)
মুক্তির সাল: ১৯৮৯
নানা পাটেকারের অন্যতম সেরা অভিনয়ের উদাহরণ এই অপরাধভিত্তিক চলচ্চিত্র। আন্না চরিত্রে তাঁর ভয়ংকর উপস্থিতি ও সংযত অভিনয় সিনেমাটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান।
2. ক্রান্তিবীর (Krantiveer)
মুক্তির সাল: ১৯৯৪
প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে নানা পাটেকারের প্রতিবাদী অভিনয় এই সিনেমার প্রধান আকর্ষণ। সামাজিক অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র সংলাপ দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
3. প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক (Prahaar: The Final Attack)
মুক্তির সাল: ১৯৯১
এই সিনেমায় নানা পাটেকার একজন সেনা কর্মকর্তা মেজর চৌহানের ভূমিকায় অভিনয় করেন। শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও সহিংসতার মানসিক প্রভাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ছবিটি পরিচালনা ও চিত্রনাট্য রচনার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
4. তিরঙ্গা (Tirangaa)
মুক্তির সাল: ১৯৯৩
দেশপ্রেম, অপরাধ দমন ও জাতীয় নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে নানা পাটেকারের শিবাজিরাও ওয়াগলে চরিত্রটি দর্শকের নজর কাড়ে। তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি ও সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ।
5. আব তক ছাপ্পান (Ab Tak Chhappan)
মুক্তির সাল: ২০০৪
সাধু আগাশে নামের এক এনকাউন্টার পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে নানা পাটেকার অসাধারণ সংযম ও তীব্রতা দেখিয়েছেন। অপরাধজগতের সঙ্গে লড়াই, ব্যক্তিগত শোক এবং পুলিশের কাজের নৈতিক জটিলতা সিনেমাটিকে শক্তিশালী করেছে।
6. ওয়েলকাম (Welcome)
মুক্তির সাল: ২০০৭
উদয় শেঠি চরিত্রে নানা পাটেকার প্রমাণ করেন, তিনি শুধু গম্ভীর বা খলনায়কসুলভ চরিত্রেই দক্ষ নন। কমেডি, বিরক্তি, আবেগ ও অদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছবিটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তাঁর অভিনয় এখানে হাস্যরসের অন্যতম প্রধান উৎস।
7. নাটসম্রাট (Natsamrat)
মুক্তির সাল: ২০১৬
গণপতরাও বেলওয়ালকর নামের এক প্রবীণ মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে নানা পাটেকারের অভিনয় আবেগঘন ও স্মরণীয়। বার্ধক্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতা ও আত্মমর্যাদার সংকট তিনি গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মারাঠি ভাষার অভিনয় দেখতে চাইলে এটি অবশ্যই তালিকায় রাখুন।
8. অগ্নিসাক্ষী (Agni Sakshi)
মুক্তির সাল: ১৯৯৬
এই মনস্তাত্ত্বিক নাটকে নানা পাটেকার এমন এক জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যার আচরণের আড়ালে রয়েছে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। চরিত্রটির অস্বস্তিকর দিকগুলোকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা তাঁর অভিনয়ক্ষমতার পরিচয়।
9. খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (Khamoshi: The Musical)
মুক্তির সাল: ১৯৯৬
জোসেফ ব্রাগাঞ্জা চরিত্রে নানা পাটেকার একজন শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী মেয়ের বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, আবেগের সংঘাত ও বাবা-মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা এই ছবির মূল শক্তি।
10. ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো (Dr. Prakash Baba Amte: The Real Hero)
মুক্তির সাল: ২০১৪
বাস্তব সমাজসেবী ও চিকিৎসক প্রকাশ আমটের জীবনের ওপর নির্মিত এই মারাঠি চলচ্চিত্রে নানা পাটেকার মানবিক ও বাস্তবধর্মী অভিনয় করেছেন। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করা একজন মানুষের সংগ্রাম ও দায়িত্ববোধকে তুলে ধরার জন্য ছবিটি উল্লেখযোগ্য।
এই তালিকাটি অভিনয়ের বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং চলচ্চিত্রের স্মরণীয়তার ভিত্তিতে তৈরি—এটি কোনো আনুষ্ঠানিক র্যাঙ্কিং নয়। সিনেমাগুলোর মুক্তির সাল ও ভূমিকার তথ্য চলচ্চিত্রতালিকা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নানা পাটেকারের সিনেমা দেখার আগে যে বিষয়গুলো জানা দরকার
- গম্ভীর অভিনয় দেখতে চাইলে: পারিন্দা, আব তক ছাপ্পান ও নাটসম্রাট।
- প্রতিবাদী ও দেশপ্রেমমূলক চরিত্র পছন্দ হলে: ক্রান্তিবীর ও তিরঙ্গা।
- কমেডি উপভোগ করতে চাইলে: ওয়েলকাম।
- বাস্তব জীবনের মানুষের ওপর নির্মিত সিনেমা দেখতে চাইলে: ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো।
- চরিত্রের মানসিক জটিলতা বুঝতে চাইলে: অগ্নিসাক্ষী ও খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল।