ইতিহাস কি সব সময় বিজয়ীদের কথাই বলে? পরাজিত মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়? ক্ষমতাবানদের রচিত ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা মানুষের গৌরবগাথা নতুন করে আবিষ্কারের এক অসাধারণ সাহিত্যিক প্রয়াস জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’ উপন্যাস। জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১২-এ স্বীকৃত এই ঐতিহাসিক উপন্যাস পাঠককে নিয়ে যায় বাংলার অতীতের এমন এক অধ্যায়ে, যেখানে ভূমিপুত্রদের সংগ্রাম, রাজনৈতিক সংঘাত ও ইতিহাসের বয়ান একসূত্রে মিলিত হয়েছে।
রোদেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হার্ডকভার বইটি ইতিহাসপ্রেমী ও বাংলা উপন্যাসের পাঠকদের জন্য আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য বই।
কৈবর্তদের সংগ্রাম: ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক অধ্যায়
‘পিতৃগণ’ উপন্যাসের পটভূমিতে রয়েছে বরেন্দ্রভূমির কৈবর্ত বিদ্রোহ এবং ভীমের নেতৃত্বে ভূমিপুত্রদের প্রতিরোধের কাহিনি। উপন্যাসের ফ্ল্যাপে বর্ণিত হয়েছে, ভীম ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করতে রামপালের সঙ্গে যোগ দেয় আঠারো রাজা, সামন্ত ও মহাসামন্ত। বিশাল বাহিনী নিয়ে শুরু হয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংঘাত।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নিজের ভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা মানুষদের ইতিহাস কীভাবে লেখা হয়? বিজয়ী পক্ষের রাজসভায় রচিত কাব্য ও বীরগাথা যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে পরাজিত পক্ষের সত্য কে তুলে ধরবে?
উপন্যাসটি এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানকে নতুনভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি করে।
ইতিহাসের বয়ান বনাম ভূমিপুত্রদের আত্মপরিচয়
উপন্যাসের ফ্ল্যাপে সন্ধ্যাকর নন্দীর প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রামপালের সভাকবি হিসেবে তাঁর কাব্যে রামপালের পক্ষের অবস্থান প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর বিপরীতে রয়েছে কৈবর্তদের সংগ্রাম ও তাদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
ইতিহাসের এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে কেবল অতীতের যুদ্ধের বিবরণে সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং এটি পাঠককে ভাবতে শেখায়—কার কণ্ঠস্বর ইতিহাসে জায়গা পায়, আর কার অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায় ক্ষমতার বয়ানের আড়ালে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘পিতৃগণ’ পূর্বপুরুষের গৌরব, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে চিন্তার খোরাক জোগায়।
কবি পপীপ: কলম ও অস্ত্র হাতে ইতিহাসের সন্ধানে
উপন্যাসের আরেকটি আকর্ষণীয় চরিত্র কৈবর্ত-কবি পপীপ। দাসজন্মের শৃঙ্খল ভেঙে মাতৃভূমিতে ফিরে আসা এই চরিত্রের মাধ্যমে লেখক ইতিহাসের স্মৃতি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে একসূত্রে গেঁথেছেন।
পুঁথি, ভূর্জপত্র, খাগের লেখনি ও কালি যেমন জ্ঞান এবং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতীক, তেমনি অস্ত্র হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক। পপীপের এই দ্বৈত ভূমিকা উপন্যাসের ভাবনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এখানে ইতিহাস উদ্ধার করা মানে শুধু অতীতকে জানা নয়; বরং বিস্মৃত মানুষের সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টাও।
কেন পড়বেন ‘পিতৃগণ’?
যাঁরা বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস, প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক সংঘাত, ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য ‘পিতৃগণ’ হতে পারে আকর্ষণীয় পাঠ। উপন্যাসটি ইতিহাসকে শুধু রাজা-রাজড়ার কাহিনি হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষ ও ভূমিপুত্রদের অবস্থান থেকেও উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।
বইটির বিশেষ পরিচিতি: জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১২-এ স্বীকৃত এই উপন্যাসের রচয়িতা জাকির তালুকদার।
আপনার সংগ্রহে রাখুন ‘পিতৃগণ’
ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়, পূর্বপুরুষের গৌরব এবং বাংলার অতীত নিয়ে আগ্রহ থাকলে জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’ আপনার পাঠতালিকায় রাখতে পারেন।
📚 পিতৃগণ উপন্যাসটি দেখুন ও অর্ডার করুন
অতীতের ইতিহাস শুধু বিজয়ের স্মারক নয়; তার ভেতরে থাকে পরাজিত মানুষের কান্না, প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ‘পিতৃগণ’ সেই বিস্মৃত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সাহিত্যিক আমন্ত্রণ—যেখানে পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন করে আবিষ্কৃত হতে পারে আমাদের শিকড় ও আত্মপরিচয়।