কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠস্বর থেকে যায়। কিছু মুখ হারিয়ে যায় সময়ের ওপারে, অথচ তাঁদের অভিনীত চরিত্রগুলো বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের তেমনই এক শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকারকে ঘিরে মৃত্যুসংবাদের দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এই খবরে তাঁর ভক্তদের মনে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও আবেগ।
তবে তাঁর মৃত্যুর খবর নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে প্রয়াত ঘোষণা করা উচিত নয়। কারণ, একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে ঘিরে ভুল সংবাদ ছড়িয়ে পড়া তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও অসংখ্য ভক্তের জন্য বেদনাদায়ক হতে পারে।
নানা পাটেকারের জীবন ও অভিনয়জীবনের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, কেন তিনি ভারতীয় সিনেমার দর্শকদের কাছে এতটা বিশেষ।
যে কণ্ঠে ছিল আগুন, যে চোখে ছিল হাজার গল্প
নানা পাটেকার এমন একজন অভিনেতা, যাঁকে পর্দায় দেখলে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল স্বতন্ত্র, সংলাপ বলার ভঙ্গি ছিল অনন্য, আর অভিনয়ের মধ্যে ছিল এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তবতা।
তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না, চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলতেন। কখনো তাঁর চোখে ফুটে উঠত ক্রোধ, কখনো অসহায়ত্ব, আবার কখনো এমন এক বেদনা, যা দর্শকের হৃদয়ে নীরবে আঘাত করত।
অনেক অভিনেতা পর্দায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন। কিন্তু নানা পাটেকার ছিলেন তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম, যাঁর উপস্থিতি পুরো দৃশ্যের আবহ বদলে দিতে পারত। তাঁর অভিনয়ে কৃত্রিমতার চেয়ে বাস্তবতার ছাপ ছিল বেশি। আর এ কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বতন্ত্র এক অভিনয়-ব্যক্তিত্ব।
‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘ওয়েলকাম’—বৈচিত্র্যই ছিল তাঁর শক্তি
মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বিশ্বনাথ পাটেকার চলচ্চিত্রজগতে নানা পাটেকার নামেই পরিচিতি লাভ করেন। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন তাঁকে ভারতের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
‘পারিন্দা’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘ক্রান্তিবীর’-এ তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ‘আব তক ছাপ্পান’-এ কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্র কিংবা ‘রাজনীতি’তে রাজনৈতিক ক্ষমতার জটিল জগতে তাঁর অভিনয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন।
অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ চলচ্চিত্রে উদয় শেঠি চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে, গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও তিনি কতটা অসাধারণ।
তাঁর সংলাপ, অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের স্বাভাবিকতা দর্শকদের হাসিয়েছে বছরের পর বছর। আর ‘নাটসম্রাট’-এর মতো মারাঠি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দেখিয়েছে, একজন শিল্পী কীভাবে চরিত্রের যন্ত্রণা, অহংকার ও নিঃসঙ্গতাকে নিজের করে নিতে পারেন।
পুরস্কারের বাইরেও ছিল তাঁর অনন্য পরিচয়
নানা পাটেকার তিনবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
তবে তাঁর প্রকৃত অর্জন শুধু পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো দর্শকের মনে দীর্ঘদিন ধরে জায়গা করে নিয়েছে।
তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, অভিনয় মানে শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো নয়। অভিনয় মানে মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে বুঝতে পারা, চরিত্রের যন্ত্রণাকে অনুভব করা এবং সেই অনুভূতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তাঁর অভিনয়ে কখনো অকারণ চাকচিক্যের প্রয়োজন হয়নি। একটি দৃষ্টি, সামান্য বিরতি কিংবা সংলাপের একটি বিশেষ উচ্চারণেই তিনি দৃশ্যের গভীরতা বাড়িয়ে দিতে পারতেন।
পর্দার বাইরেও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা
নানা পাটেকারের পরিচয় শুধু চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষ করে কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের সহায়তায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘নাম ফাউন্ডেশন’ কাজ করেছে।
একজন শিল্পীর জীবনের মূল্য কেবল তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের জীবনে তিনি কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নানা পাটেকারের সামাজিক উদ্যোগ তাঁর ব্যক্তিত্বের এই দিকটিকেও সামনে এনেছে।
তাঁর জীবন তাই একদিকে শিল্পের প্রতি নিষ্ঠার গল্প, অন্যদিকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতারও গল্প।
নানা পাটেকার কেন দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন?
ভারতীয় সিনেমায় অসংখ্য জনপ্রিয় অভিনেতা এসেছেন। কিন্তু সবাই নিজেদের অভিনয়শৈলী দিয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারেননি। নানা পাটেকার সেই বিরল অভিনেতাদের একজন, যিনি প্রচলিত নায়কোচিত ধারণার বাইরে গিয়েও দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
তাঁর অভিনয়ে ছিল বাস্তব জীবনের মানুষের রাগ, অভিমান, হতাশা, সাহস ও অসহায়ত্বের প্রতিফলন। তিনি কখনো কঠোর, কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো হাস্যরসাত্মক—প্রতিটি রূপেই দর্শককে বিশ্বাস করাতে পেরেছেন যে পর্দার চরিত্রটি সত্যিই জীবন্ত।
এই অভিনয়ক্ষমতাই তাঁকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।
তাঁর অভিনয় বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
চলচ্চিত্রের পর্দায় নানা পাটেকারের অভিনয় বারবার নতুন দর্শকের কাছে ফিরে আসবে। কোনো এক সন্ধ্যায় টেলিভিশনে তাঁর পুরোনো সিনেমা চলবে। ‘ক্রান্তিবীর’-এর কোনো দৃশ্য কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর কোনো হাস্যরসাত্মক মুহূর্ত দর্শককে আবারও মনে করিয়ে দেবে, এই মানুষটি কতটা ব্যতিক্রমী।
সময় বদলাবে, নতুন তারকা আসবেন, নতুন সিনেমা তৈরি হবে। কিন্তু কিছু শিল্পীর জায়গা কখনো পুরোপুরি পূরণ হয় না। নানা পাটেকার সেই বিশেষ শিল্পীদের একজন, যাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা চলবে দীর্ঘদিন।
শেষ কথা
একজন শিল্পীর প্রকৃত জীবনকাল শুধু তাঁর বেঁচে থাকার সময় দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাঁর কাজ মানুষের মনে কত দিন বেঁচে থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নানা পাটেকারের অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন এক স্বতন্ত্র অধ্যায়, যা দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গি এবং পর্দায় উপস্থিতির তীব্রতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তাঁকে ঘিরে মৃত্যুসংবাদের দাবি সত্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তবে তাঁর শিল্পীসত্তার গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
নানা পাটেকার—একটি নাম, একটি স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী, ভারতীয় সিনেমার এক স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর শিল্পকর্মের আবেদন দর্শকের মনে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।