সকালবেলা ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি ছাড়া অনেকেরই দিন শুরু হয় না। কিন্তু এই কফি ভালোবাসার ক্ষেত্রে কিছু দেশ বাকি পুরো বিশ্বকে রীতিমতো টেক্কা দেয়। ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর শীর্ষ ১০টি কফিপ্রেমী দেশের তালিকা এক নজরে দেখলে বোঝা যায়, ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে কফি কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক বার্ষিক মাথাপিছু কফি ব্যবহারের (কেজি) ভিত্তিতে সেই শীর্ষ ১০ দেশের কফি সংস্কৃতির গল্প।
১. ফিনল্যান্ড (৯.৬ কেজি)
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কফি পান করা দেশ হলো ফিনল্যান্ড। এখানকার একজন নাগরিক বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে নয় কেজির বেশি কফি সাবাড় করেন! প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়া তো বটেই, ফিনিশ সংস্কৃতিতে কফি এতটাই অবিচ্ছেদ্য যে সেখানে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য আইনগতভাবে দৈনিক দুটি কফি পানের বিরতি (Kahvitauko) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
২. নরওয়ে (৭.২ কেজি)
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নরওয়ে। নরওয়েজিয়ানদের কাছে কফি কেবল পানীয় নয়, এটি সামাজিকতার প্রতীক। সেখানে সকাল, দুপুর কিংবা রাত—যেকোনো আড্ডার মূল আকর্ষণই থাকে কফি। বিশেষ করে ব্ল্যাক কফি তাদের সবচেয়ে পছন্দ।
৩. নেদারল্যান্ডস (৬.৭ কেজি)
ডাচদের কফি সংস্কৃতির ইতিহাস বহু পুরনো। নেদারল্যান্ডসের মানুষ গড়ে প্রতিদিন একাধিক কাপ কফি পান করেন। কাজের ফাঁকে কিংবা ক্যাফেতে বসে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়ার সাথে এক কাপ চমৎকার কফি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ।
৪. সুইডেন (৬.৫ কেজি)
সুইডেনে কফি পান করার একটি নিজস্ব দর্শন রয়েছে, যাকে বলা হয় 'ফিকা' (Fika)। ফিকা হলো মূলত কাজ থেকে ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে বন্ধুদের সাথে কফি ও পেস্ট্রি বা কেক খাওয়া। এই ফিকা সংস্কৃতির কারণেই সুইডিশরা কফি ব্যবহারের দিক থেকে চার নম্বরে অবস্থান করছে।
৫. স্লোভেনিয়া (৬.১ কেজি)
তালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা মধ্য ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়ায় কফি পানের ঐতিহ্য দারুণ সমৃদ্ধ। বিশেষ করে ক্যাফেগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আড্ডা দেওয়া এবং গাঢ়, কড়া ধাঁচের তুর্কি কফি উপভোগ করা তাদের জীবনযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৬. অস্ট্রিয়া (৫.৫ কেজি)
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার কফিহাউস কালচার বিশ্ববিখ্যাত। ইউনেস্কো এটিকে 'অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মার্বেল টেবিল আর আরামদায়ক সোফায় বসে ঐতিহ্যবাহী 'মেলঞ্জ' (এক ধরনের ভিয়েনিজ কফি) উপভোগ করা অস্ট্রিয়ানদের পরম তৃপ্তির জায়গা।
৭. সার্বিয়া (৫.৪ কেজি)
সার্বিয়ার মানুষ কফি পানের ক্ষেত্রে আড্ডা ও সামাজিক মেলবন্ধনকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। সেখানে তুর্কি ধাঁচের ঘরোয়া কালো কফি (Domestic Coffee) সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং অতিথি আপ্যায়নের প্রথম অনুষঙ্গ।
৮. ডেনমার্ক (৫.৩ কেজি)
ডেনিশদের একটি বিখ্যাত জীবনদর্শন আছে—'হুগা' (Hygge), যার অর্থ হলো ঘরোয়া পরিবেশে এক অদ্ভুত আরামদায়ক ও উষ্ণ অনুভূতি তৈরি করা। আর এই হুগা অনুভূতির অন্যতম প্রধান সঙ্গী হলো এক কাপ গরম কফি।
৯. জার্মানি (৫.২ কেজি)
জার্মানিতে পানির পরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় হলো কফি। তারা ফিল্টার কফি বা এক্সপ্রেসো দিয়ে দিন শুরু করতে পছন্দ করেন। বিকেলবেলা কফি ও কেক খাওয়া (Kaffee und Kuchen) তাদের একটি চমৎকার পারিবারিক ঐতিহ্য।
১০. বেলজিয়াম (৪.৯ কেজি)
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম। বিশ্বখ্যাত বেলজিয়ান চকোলেট ও ওয়াফেলের পাশাপাশি এখানকার মানুষ কফি পানেও দারুণ অভ্যস্ত। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা নান্দনিক ক্যাফেগুলোই তাদের এই কফিপ্রেমের বড় প্রমাণ।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপের ঠান্ডা আবহাওয়া এবং তাদের সামাজিক কফি পানের ঐতিহ্য বা 'ক্যাফে কালচার' এই দেশগুলোকে কফি ব্যবহারের দিক থেকে পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে অনন্য করে তুলেছে।