বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকটি মোটের ওপর ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশ মোট ১৩.০৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ১২.৩১৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭৮১ মিলিয়ন ডলার বা ৬.৩৪ শতাংশ।
তিন মাসে রপ্তানি আয় ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
EPB-এর হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৩,০৯৪.১৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আয় ছিল ১২,৩১৩.১৭ মিলিয়ন ডলার।
| সূচক | জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ | জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রবৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| মোট পণ্য রপ্তানি | $13.094 বিলিয়ন | $12.313 বিলিয়ন | 6.34% |
| সেপ্টেম্বরের রপ্তানি | $3.937 বিলিয়ন | $3.628 বিলিয়ন | 8.54% |
| তৈরি পোশাক | $10.579 বিলিয়ন | $9.970 বিলিয়ন | 6.10% |
সেপ্টেম্বর মাস একাই এই প্রান্তিকের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশের সমান ছিল। ওই মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩.৯৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৩.৬২৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৮.৫৪ শতাংশ বেশি।
তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের রপ্তানি কমেছে ১১.১১ শতাংশ। অর্থাৎ মাসভিত্তিক হিসাবে কিছুটা পতন থাকলেও বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে সেপ্টেম্বরের পারফরম্যান্স যথেষ্ট শক্তিশালী।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মূল ভরসা তৈরি পোশাক
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এখনও তৈরি পোশাক বা RMG। জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১০.৫৭৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯.৯৭০ বিলিয়ন ডলার।
প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.১০ শতাংশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোট ৭৮১ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বৃদ্ধির মধ্যে তৈরি পোশাক খাত একাই প্রায় ৬০৮ মিলিয়ন ডলার বাড়তি আয় করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৭৮ শতাংশ এসেছে RMG খাত থেকে।
মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০.৮ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা এখনও অত্যন্ত বেশি।
নিট ও ওভেন—দুই খাতেই প্রবৃদ্ধি
তৈরি পোশাকের মধ্যে নিটওয়্যার তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে।
জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫.৯৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬.৮৮ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে ওভেন পোশাক থেকে আয় হয়েছে ৪.৬১৫ বিলিয়ন ডলার, যা বেড়েছে ৫.১১ শতাংশ।
সেপ্টেম্বর মাসেও দুই ধরনের পোশাক রপ্তানিতে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে বছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
পোশাকের বাইরে কোন খাতগুলো ভালো করেছে?
বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, বেশ কয়েকটি অপ্রধান খাতও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
ওষুধ রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন
ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ খাতের রপ্তানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তিন মাসে এই খাতের রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৭৬.৫৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০.৩৯ শতাংশ বেশি।
আর সেপ্টেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও চমকপ্রদ—৬৪.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে ওষুধ শিল্প ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পাট ও পাটজাত পণ্যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতের পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে।
জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২৫৩.৭৫ মিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১.৫৫ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে পাটের সুতা ও টুইন রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেপ্টেম্বর মাসেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২২.৭২ শতাংশ।
চামড়া খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যও প্রথম প্রান্তিকে ভালো করেছে। খাতটিতে প্রায় ১৪.৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২০.১৯ শতাংশ।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হলো চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।
হোম টেক্সটাইল
হোম টেক্সটাইল রপ্তানিও ইতিবাচক ছিল। তিন মাসে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ১১.৯৪ শতাংশ।
সেপ্টেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.৫২ শতাংশ। ফলে পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইলও বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ১৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানি জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে ১৬.৫১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৯২.৬৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। কারণ তৈরি পোশাকের বাইরে শিল্পভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু সব খাত ভালো করেনি
সামগ্রিক রপ্তানি ৬.৩৪ শতাংশ বাড়লেও সব পণ্যের রপ্তানি সমানভাবে বাড়েনি।
বিশেষ করে প্রাথমিক পণ্য বা Primary Commodities-এর রপ্তানি কমেছে ১২.৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৩.৭৪ শতাংশ এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি কমেছে ১০.২৭ শতাংশ।
চিংড়ি রপ্তানিতেও প্রায় ১৯.১০ শতাংশ পতন হয়েছে।
ফলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মূলত তৈরি পোশাক এবং কয়েকটি নির্বাচিত শিল্পপণ্যের ওপর নির্ভর করে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র
বাজারের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২.৫৯২ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৩৪ শতাংশ বেশি।
এর পর রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১.৩৭০ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি, যেখানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১.২১৯ বিলিয়ন ডলার।
উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্ক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২১০.৫৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০০.১১ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরের ফলাফল কি নতুন গতি নির্দেশ করছে?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তথ্যকে দুইভাবে দেখা যায়।
একদিকে, ৬.৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ৮.৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখায় যে রপ্তানি খাত আগের দুর্বল সময়ের পর কিছুটা গতি ফিরে পাচ্ছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ এখনও তৈরি পোশাক থেকে আসা বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর বড় একটি দুর্বলতা। একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, মূল্য, শুল্কনীতি বা সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন হলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই শুধু রপ্তানি আয় বাড়ানো নয়, রপ্তানির পণ্য ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনা আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
EPB-এর জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়—
প্রথমত, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তিন মাসে আয় বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ।
দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাক এখনও বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রপ্তানির প্রায় ৮০.৮ শতাংশ এই খাত থেকে এসেছে।
তৃতীয়ত, ওষুধ, পাট, চামড়া, হোম টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের মতো কয়েকটি খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
চতুর্থত, কৃষিপণ্য ও মাছের মতো ঐতিহ্যবাহী কিছু খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, মান, আন্তর্জাতিক বাজার এবং মূল্য প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও তুরস্কের মতো বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
সামনে কী?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা। তবে শুধু একটি প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি দিয়ে পুরো অর্থবছরের রপ্তানি পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক হবে না।
আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে—তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, ওষুধ ও চামড়ার মতো সম্ভাবনাময় খাত সম্প্রসারণ, পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার বাড়ানো এবং নতুন দেশে নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করা।
সব মিলিয়ে EPB-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।