কোনো দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে তার প্রভাব কতটা থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, সোনা, তামা কিংবা মূল্যবান কাঠের মতো সম্পদ একটি দেশের ভাগ্য রাতারাতি বদলে দিতে পারে। ২০২১ সালে স্ট্যাটিস্তার (Statista) এক গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক দেশগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন দেশগুলোর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বেশি সম্পদ।
১. রাশিয়া (৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার)
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হলো রাশিয়া। ভৌগোলিক বিশালতার কারণেই এই দেশটিতে অঢেল সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে। রাশিয়ার মূল শক্তির উৎস হলো তার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খনিজ তেলের ভাণ্ডার। এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লা এবং মূল্যবান ধাতুর মজুদও রয়েছে রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার প্রভাব কতটা গভীর, তা এই সম্পদের পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়।
২. যুক্তরাষ্ট্র (৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার)
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সম্পদের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কয়লা এবং প্রাকৃতিক কাঠ (Timber)। তবে গত কয়েক দশকে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেল অয়েল (Shale Oil) এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এছাড়া সোনা, তামা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থেরও বিশাল মজুদ রয়েছে এই পরাশক্তি দেশটির হাতে।
৩. সৌদি আরব (৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার)
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তেলের খনি। সৌদি আরবের মোট প্রাকৃতিক সম্পদের প্রায় সম্পূর্ণটাই হলো অপরিশোধিত খনিজ তেল। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে এই দেশে। তবে তেলের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি তাদের বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনেও নজর দিচ্ছে।
৪. কানাডা (৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার)
সৌদি আরবের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছে উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা। দেশটির তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা অঞ্চলের ‘অয়েল স্যান্ডস’ বা তৈলাক্ত বালু কানাডাকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল মজুদকারী দেশে পরিণত করেছে। তেলের পাশাপাশি কানাডায় রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইউরেনিয়াম এবং কাঠের মজুদ। এছাড়া সোনা, দস্তা এবং নিকেলের মতো মূল্যবান ধাতুর ক্ষেত্রেও কানাডা বেশ সমৃদ্ধ।
৫. ইরান (২৭ ট্রিলিয়ন ডলার)
ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরান রয়েছে এই তালিকার পঞ্চম স্থানে। পারস্য উপসাগরের এই দেশটির মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ এবং চতুর্থ বৃহত্তম খনিজ তেলের মজুদ। প্রতিকূল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেবল এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভর করেই ইরান তাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।
৬. চীন (২৩ ট্রিলিয়ন ডলার)
বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা উৎপাদনের মূল কেন্দ্র হলো চীন। আর এই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর কাঁচামাল ও খনিজ সম্পদ। চীনের মাটির নিচে রয়েছে বিশাল কয়লার মজুদ, যা তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উৎস। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্টফোন এবং ব্যাটারি তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ বা বিরল খনিজ উপাদানের ৯০ শতাংশেরও বেশির মালিক চীন।
৭. ব্রাজিল (২২ ট্রিলিয়ন ডলার)
ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র দেশ হিসেবে শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ব্রাজিল। দেশটির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর আমাজন রেইনফরেস্ট, যা থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ পাওয়া যায়। এছাড়া ব্রাজিলে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ লোহার আকরিক (Iron Ore) এবং সোনার মজুদ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সমুদ্র উপকূলে বিশাল তেলের খনির সন্ধান মেলায় এর সম্পদের মূল্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
৮. অস্ট্রেলিয়া (২০ ট্রিলিয়ন ডলার)
ওশেনিয়া অঞ্চলের এই দ্বীপ মহাদেশটি খনিজ উপাদানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অস্ট্রেলিয়ার আয়ের বড় উৎস হলো লোহার আকরিক, কয়লা এবং সোনা। এছাড়া বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জি বিপ্লবের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান ‘লিথিয়াম’ ও ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে এই দেশটির মাটির নিচে।
৯. ইরাক (১৬ ট্রিলিয়ন ডলার)
যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ইরাক প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে অত্যন্ত ভাগ্যবানী একটি দেশ। ইরাকের প্রায় সমস্ত সম্পদই হলো খনিজ তেল। দেশটির মাটির নিচে ১১৫ বিলিয়নেরও বেশি অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তেলের পাশাপাশি সামান্য পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও রয়েছে এখানে।
১০. ভেনেজুয়েলা (১৪ ট্রিলিয়ন ডলার)
তালিকার দশম স্থানে থাকা ভেনেজুয়েলার একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে—বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের মজুদ (Proven Oil Reserve) রয়েছে এই দেশটিতে, যা এমনকি সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে তারা এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে পারেনি। তেলের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় প্রচুর পরিমাণে সোনা এবং হীরা রয়েছে।