যুক্তরাজ্য (ইউকে) দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় অভিবাসন গন্তব্য। উন্নত অর্থনীতি, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখানে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ফলে আজকের ব্রিটেন একটি সত্যিকারের বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে শতাধিক ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে বসবাস করছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বিদেশে জন্ম নেওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু দেশের নাগরিক সংখ্যার দিক থেকে বিশেষভাবে এগিয়ে। চলুন জেনে নেওয়া যাক যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী শীর্ষ ১০ বিদেশি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে।
১. ভারত 🇮🇳 — ১০.৪ লাখ
ভারতীয়রা বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদেশি জনগোষ্ঠী। প্রায় ১০ লাখ ৪০ হাজার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বা ভারতে জন্মগ্রহণকারী মানুষ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
ভারত ও ব্রিটেনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত চাকরির বাজার ভারতীয়দের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং ব্যবসা খাতে ভারতীয়দের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. পোল্যান্ড 🇵🇱 — ৯,০২,১৯৩
পোল্যান্ডের নাগরিকরা যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশি জনগোষ্ঠী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে পোলিশ নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে সহজে যুক্তরাজ্যে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
বিশেষ করে নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন এবং সেবা খাতে পোলিশ কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। তাদের কঠোর পরিশ্রম এবং কর্মদক্ষতা ব্রিটিশ শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
৩. রোমানিয়া 🇷🇴 — ৭,১৩,৫৭৮
রোমানিয়ান জনগোষ্ঠী গত এক দশকে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সাত লাখেরও বেশি রোমানিয়ান যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
তারা নির্মাণশিল্প, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে তারা সহজেই যুক্তরাজ্যে কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন।
৪. পাকিস্তান 🇵🇰 — ৭,০৩,৩০৯
পাকিস্তানি জনগোষ্ঠী যুক্তরাজ্যের অন্যতম পুরোনো এবং সুপ্রতিষ্ঠিত অভিবাসী সম্প্রদায়। বর্তমানে প্রায় সাত লাখ পাকিস্তানি সেখানে বসবাস করছেন।
বিশেষত লন্ডন, বার্মিংহাম, ব্র্যাডফোর্ড এবং ম্যানচেস্টারে পাকিস্তানি কমিউনিটির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ব্যবসা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
৫. আয়ারল্যান্ড 🇮🇪 — ৩,৬০,৪৪৬
আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আইরিশ জনগণ ব্রিটেনে বসবাস করে আসছেন।
অনেক আইরিশ নাগরিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং পারিবারিক কারণে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। দুই দেশের মধ্যে বিশেষ ভ্রমণ ও বসবাসের সুবিধা এই অভিবাসনকে আরও সহজ করেছে।
৬. ইতালি 🇮🇹 — ৩,৪২,১৪৩
ইতালীয়রা যুক্তরাজ্যের অন্যতম পরিচিত ইউরোপীয় অভিবাসী সম্প্রদায়। প্রায় সাড়ে তিন লাখ ইতালীয় বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
রেস্তোরাঁ ব্যবসা, ফ্যাশন, শিল্পকলা, শিক্ষা এবং আর্থিক খাতে ইতালীয়দের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। লন্ডনসহ বড় শহরগুলোতে ইতালীয় সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট।
৭. নাইজেরিয়া 🇳🇬 — ৩,২৪,০০৭
আফ্রিকার মধ্যে নাইজেরিয়া থেকে আসা মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তিন লাখেরও বেশি নাইজেরিয়ান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
উচ্চশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে নাইজেরিয়ানদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রিটিশ সমাজে তারা একটি প্রভাবশালী আফ্রিকান সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত।
৮. বাংলাদেশ 🇧🇩 — ২,৯৮,৬৬৬
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী যুক্তরাজ্যের অন্যতম সফল দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটি। প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন।
বিশেষ করে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় বাংলাদেশিদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। রেস্তোরাঁ ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে বাংলাদেশিদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার কারণে চিকিৎসা, আইন, প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সাফল্য দেখা যাচ্ছে।
৯. জার্মানি 🇩🇪 — ২,৮৭,৭৭২
প্রায় তিন লাখ জার্মান নাগরিক যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। শিক্ষা, গবেষণা, প্রকৌশল এবং আর্থিক খাতে জার্মানদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
বিশেষত লন্ডন এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে জার্মান পেশাজীবীদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
১০. ইউক্রেন 🇺🇦 — ২,৭৪,১৮৭
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেন থেকে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্য বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচির মাধ্যমে ইউক্রেনীয় শরণার্থী ও অভিবাসীদের আশ্রয় দিয়েছে।
বর্তমানে দুই লাখ ৭৪ হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং তারা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সমাজে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।
কেন যুক্তরাজ্য অভিবাসীদের জন্য এত আকর্ষণীয়?
যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:
- উন্নত জীবনযাত্রার মান
- আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা
- শক্তিশালী অর্থনীতি
- উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ
- উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা
- বহুসাংস্কৃতিক ও সহনশীল সমাজ
- স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের সুযোগ
বাংলাদেশিদের জন্য এই তালিকার গুরুত্ব
এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এটি শুধু অভিবাসনের সংখ্যা নয়, বরং বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানেরও প্রতিফলন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং নতুন প্রজন্ম শিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।
আজকের যুক্তরাজ্য বিশ্বের নানা সংস্কৃতির মানুষের মিলনস্থল। ভারত, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, পাকিস্তান থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও ইউক্রেন—প্রতিটি সম্প্রদায় ব্রিটিশ সমাজকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করেছে। এই বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশই আধুনিক ব্রিটেনের অন্যতম শক্তি, যেখানে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য একসঙ্গে সহাবস্থান করছে।
বাংলাদেশিদের জন্য সুখবর হলো, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি ক্রমশ শক্তিশালী ও সফল হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।