আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব কম দেশই আছে যাদের নিয়ে এত বেশি বিতর্ক, আলোচনা এবং মতবিরোধ দেখা যায়, যতটা দেখা যায় ইসরায়েলকে ঘিরে। মধ্যপ্রাচ্যের এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কারণে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে “খুবই নেতিবাচক” (Very Unfavorable) মনোভাবের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনেক দেশে জনমতের বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন দেশগুলোতে ইসরায়েল সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক জনমত রয়েছে এবং এর পেছনে কী কারণ কাজ করছে।
ইসরায়েল সম্পর্কে সবচেয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারী ১০ দেশ
| অবস্থান | দেশ | খুবই নেতিবাচক মতামত |
|---|---|---|
| ১ | 🇹🇷 তুরস্ক | ৯১% |
| ২ | 🇲🇾 মালয়েশিয়া | ৭৯% |
| ৩ | 🇮🇩 ইন্দোনেশিয়া | ৬৮% |
| ৪ | 🇧🇩 বাংলাদেশ | ৬৪% |
| ৫ | 🇪🇸 স্পেন | ৫০% |
| ৬ | 🇦🇺 অস্ট্রেলিয়া | ৪৯% |
| ৭ | 🇮🇹 ইতালি | ৪৮% |
| ৮ | 🇳🇱 নেদারল্যান্ডস | ৪৭% |
| ৯ | 🇿🇦 দক্ষিণ আফ্রিকা | ৪৪% |
| ১০ | 🇬🇧 যুক্তরাজ্য | ৪২% |
১. তুরস্ক: সবচেয়ে বেশি সমালোচনামুখর দেশ
তালিকার শীর্ষে রয়েছে তুরস্ক, যেখানে ৯১ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মতামত পোষণ করেন।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিপরীতমুখী। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযানের পর তুরস্কে ইসরায়েলবিরোধী জনমত আরও শক্তিশালী হয়েছে।
২. মালয়েশিয়া: দীর্ঘদিনের সমালোচক
মালয়েশিয়া বহু বছর ধরেই ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলের সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
দেশটির সরকার কখনোই ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যেও ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল।
৩. ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ
ইন্দোনেশিয়ায় ৬৮ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
ফিলিস্তিনের প্রতি ঐতিহাসিক সমর্থন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সংহতির কারণে দেশটিতে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
৪. বাংলাদেশ: চতুর্থ অবস্থানে
বাংলাদেশে ৬৪ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করে আসছে। গাজা ও পশ্চিম তীরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সংবাদ এবং মানবিক সংকটের চিত্র বাংলাদেশের জনমতকে প্রভাবিত করেছে।
৫. স্পেন: ইউরোপের ভিন্ন কণ্ঠ
স্পেনে ৫০ শতাংশ মানুষের খুবই নেতিবাচক মতামত রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং নাগরিক সমাজে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ফলে দেশটিতে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬. অস্ট্রেলিয়া: পরিবর্তিত জনমত
অস্ট্রেলিয়া ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমা জোটের অংশ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ইসরায়েল নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে।
৪৯ শতাংশ মানুষের নেতিবাচক মতামত দেখায় যে বিষয়টি এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক জনমতেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
৭. ইতালি: ইউরোপীয় উদ্বেগ
ইতালিতে ৪৮ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
মানবাধিকার, যুদ্ধ এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ইতালির জনমতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
৮. নেদারল্যান্ডস: ঐতিহাসিক সমর্থনের মাঝেও সমালোচনা
নেদারল্যান্ডস ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল দেশ হিসেবে পরিচিত।
তবে সাম্প্রতিক জরিপে ৪৭ শতাংশ মানুষের খুবই নেতিবাচক মতামত ইঙ্গিত দেয় যে জনমতের পরিবর্তন ঘটছে।
৯. দক্ষিণ আফ্রিকা: বর্ণবৈষম্যের ইতিহাসের প্রভাব
দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪৪ শতাংশ মানুষের নেতিবাচক মতামতের পেছনে দেশটির নিজস্ব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নিজেদের বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন।
১০. যুক্তরাজ্য: মিশ্র জনমত
যুক্তরাজ্যে ৪২ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক মতামত পোষণ করেন।
ব্রিটেনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার—উভয় বিষয়ই জনমতকে বিভক্ত করে রেখেছে।
কেন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে?
বিভিন্ন দেশে জনমত গঠনের পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ দেখা যায়:
১. গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যু
ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে সংঘাত এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বিশ্বজুড়ে মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
বর্তমানে যুদ্ধ ও সংঘাতের ছবি এবং ভিডিও দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমতকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
৩. মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আলোচনা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
৪. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংহতি
বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ফিলিস্তিনের প্রতি আবেগগত সমর্থন জনমতকে প্রভাবিত করে।
এই পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা
একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনো দেশের জনগণের একটি অংশের মতামত পুরো দেশের সরকারি অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
এছাড়া "Very Unfavorable" বা "খুবই নেতিবাচক" মতামত মানেই সবাই একই কারণে এমন মত পোষণ করেন না। কারও উদ্বেগ মানবাধিকার নিয়ে, কারও রাজনৈতিক, আবার কারও ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক কারণে হতে পারে।
ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক জনমত বর্তমানে গভীরভাবে বিভক্ত। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ইসরায়েল সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেলেও, এর পেছনের কারণ দেশভেদে ভিন্ন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, জনমত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন ঘটনা এই ধারণাকে আরও প্রভাবিত করতে পারে। তাই এই ধরনের জরিপ আমাদের বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরলেও, এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জনমতের প্রতিফলন মাত্র।