বিশ্বের সেরা শহর বলতে শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় শহরকে বোঝায় না। একটি শহর কতটা ভালোভাবে পরিচালিত হয়, সেখানে মানুষের দক্ষতা ও শিক্ষার মান কেমন, অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, পরিবেশ কতটা বাসযোগ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান—এসব বিষয়ও একটি শহরের বৈশ্বিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের 2026 Global Cities Index বিশ্বের ১,০০০ শহরকে পাঁচটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছে—গভর্ন্যান্স, অর্থনীতি, মানবসম্পদ, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার মান। এই সূচকে ২০২৬ সালের শীর্ষ ১০ শহরের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, জাপান ও সুইজারল্যান্ডের শহর রয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০ শহর
১. নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
২. লন্ডন, যুক্তরাজ্য
৩. প্যারিস, ফ্রান্স
৪. সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র
৫. সান ফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র
৬. ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড
৭. বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
৮. সান হোসে, যুক্তরাষ্ট্র
৯. টোকিও, জাপান
১০. জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
১. নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
২০২৬ সালের Global Cities Index-এ বিশ্বের এক নম্বর শহর হিসেবে উঠে এসেছে নিউইয়র্ক। অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদের দিক থেকে শহরটির বৈশ্বিক প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ নিউইয়র্কে আসে কাজ, শিক্ষা ও ব্যবসার জন্য। এর ফলে শহরটি নানা সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও সৃজনশীলতার মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিল্প, বিনোদন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় নিউইয়র্কের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে।
২. লন্ডন, যুক্তরাজ্য
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লন্ডন। শহরটি বিশেষভাবে মানবসম্পদ সূচকে প্রথম হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষ লন্ডনে বসবাস ও কাজ করতে আসেন।
শহরের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী—যা এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি বড় উদাহরণ। এই বৈচিত্র্য লন্ডনের খাবার, সংস্কৃতি ও নগরজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
একই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষেত্রেও শহরটি বড় শহর হিসেবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। কনজেশন চার্জ এবং Ultra-Low Emission Zone-এর মতো উদ্যোগ যানবাহন ও দূষণ কমাতে ভূমিকা রাখছে।
৩. প্যারিস, ফ্রান্স
তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্যারিস জীবনযাত্রার মান এবং সাংস্কৃতিক সুযোগের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শহরটিতে প্রায় ১৩০টি জাদুঘর রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পৌর জাদুঘরে ২০০১ সাল থেকে স্থায়ী সংগ্রহ দেখতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। ফলে সংস্কৃতি শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা, শিল্পকলা, জাদুঘর ও নগর সংস্কৃতির কারণে প্যারিস বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শহর হিসেবেও পরিচিত।
৪. সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র
তালিকার চতুর্থ শহর সিয়াটল। জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে শহরটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
সিয়াটলের শিল্প ও সংগীতের ইতিহাস বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। গ্রাঞ্জ সংগীতের সঙ্গে শহরটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং Nirvana ও Pearl Jam-এর মতো ব্যান্ড এই সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত।
শহরের Waterfront Park-ও নগর উন্নয়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পুরোনো একটি মহাসড়কের জায়গায় গড়ে ওঠা এই এলাকায় হাঁটার পথ, কমিউনিটি পিয়ার এবং সাইকেল লেন রয়েছে।
৫. সান ফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র
পঞ্চম স্থানে রয়েছে সান ফ্রান্সিসকো। শহরটি প্রযুক্তি, পরিবহন এবং পরিবেশগত পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত।
শহরের বিস্তৃত গণপরিবহন ব্যবস্থা বাসিন্দা ও পর্যটকদের ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে। বিখ্যাত কেবল কারসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা শহরের নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রযুক্তি খাতেও সান ফ্রান্সিসকোর অবস্থান শক্তিশালী। Meta, Uber ও Salesforce-এর মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শহরটির অর্থনৈতিক পরিচয়ের অংশ।
৬. ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন। দক্ষ কর্মী ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির কারণে শহরটি বৈশ্বিক ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
Trinity College Dublin-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহরের মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। Google, Meta, Microsoft ও Accenture-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ডাবলিনে বড় কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শহরের পরিবেশগত অবস্থানও সূচকে ভালো। তুলনামূলক কম দূষণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু-নিরপেক্ষ হওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ডাবলিনের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ।
৭. বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
সপ্তম অবস্থানে থাকা বোস্টনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো মানবসম্পদ।
শহরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ঘনত্ব অনেক বেশি। এর ফলে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বোস্টনের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে।
শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া সম্পদের একটি অংশ জনপরিসর উন্নয়নেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে Rose Kennedy Greenway-এর কথা বলা যায়। আগে যেখানে একটি উঁচু মহাসড়ক ছিল, সেখানে এখন বাগান, ফোয়ারা ও পাবলিক আর্টের সমন্বয়ে একটি উন্মুক্ত জনপরিসর তৈরি হয়েছে।
৮. সান হোসে, যুক্তরাষ্ট্র
অষ্টম স্থানে রয়েছে সান হোসে। সিলিকন ভ্যালির কেন্দ্রীয় শহরগুলোর একটি হিসেবে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকে সান হোসের মাথাপিছু জিডিপি সর্বোচ্চ ছিল। Alphabet (Google), Apple ও Nvidia-এর মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিলিকন ভ্যালির অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
প্রযুক্তি, উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান এবং উচ্চ উৎপাদনশীলতা শহরটির বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
৯. টোকিও, জাপান
নবম স্থানে রয়েছে জাপানের রাজধানী টোকিও। বিশাল জনসংখ্যা, উন্নত অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে টোকিও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহানগর।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় টোকিওর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই শহরে প্রাচীন জাপানি সংস্কৃতির পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নগর অবকাঠামোর উপস্থিতি দেখা যায়।
১০. জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
দশম স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ। অর্থনীতি, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার কারণে শহরটি বৈশ্বিক শহরগুলোর তালিকায় শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শহরটির তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার মানও এর বৈশ্বিক আকর্ষণের অংশ।
কেন এই শহরগুলো এগিয়ে?
২০২৬ সালের তালিকাটি দেখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। শীর্ষ শহরগুলো শুধু বড় অর্থনীতির ওপর নির্ভর করছে না; তারা মানবসম্পদ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার দিক থেকেও এগিয়ে।
লন্ডন ও বোস্টনের মতো শহর উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানুষের আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছে। প্যারিস ও সিয়াটল সংস্কৃতিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে শহুরে জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। লন্ডন, সান ফ্রান্সিসকো ও ডাবলিন পরিবেশগত উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে। অন্যদিকে সান হোসে ও সান ফ্রান্সিসকো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের নগরজীবনের চিত্র তুলে ধরছে।
অর্থাৎ, একটি শহরের বৈশ্বিক গুরুত্ব শুধু তার আকার বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। মানুষ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সমন্বয়ই আধুনিক বিশ্বের একটি শহরকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
সূত্র: BBC Travel ও Oxford Economics-এর 2026 Global Cities Index।