আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক-এর ডেটা বিশ্লেষণ করলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি সম্পর্কে একটি চমৎকার চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে।
জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিন্নতার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ে (Nominal GDP per capita) ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। নিচে আইএমএফ-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মাথাপিছু আয়ের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।
একনজরে দক্ষিণ এশিয়ার মাথাপিছু আয়
| দেশের নাম | মাথাপিছু আয় (মার্কিন ডলার) | অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি |
|---|---|---|
| মালদ্বীপ | ~১৯,৪৬০ | পর্যটন ও মৎস্য শিল্প |
| ভুটান | ~৪,৮৭০ | জলবিদ্যুৎ ও পর্যটন |
| শ্রীলঙ্কা | ~৪,৫২০* | তৈরি পোশাক, পর্যটন ও রেমিট্যান্স |
| বাংলাদেশ | ~২,৯১০ | তৈরি পোশাক, কৃষি ও রেমিট্যান্স |
| ভারত | ~২,৮১০ | আইটি, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত |
| পাকিস্তান | ~১,৫৮০ | টেক্সটাইল, কৃষি ও রেমিট্যান্স |
| নেপাল | ~১,৫৫০ | রেমিট্যান্স ও পর্যটন |
| আফগানিস্তান | ~৪১৭* | কৃষি ও খনিজ সম্পদ |
দেশভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. মালদ্বীপ
দক্ষিণ এশিয়ায় মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে মালদ্বীপ সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করছে। দেশটির বর্তমান মাথাপিছু আয় প্রায় ১৯,৪৬০ ডলার। এর মূল কারণ হলো তাদের বিশাল পর্যটন শিল্প এবং তুলনামূলকভাবে অনেক কম জনসংখ্যা। বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ওপর ভিত্তি করে তাদের অর্থনীতি দারুণ শক্তিশালী।
২. ভুটান
হিমালয়ের কোল ঘেঁষে থাকা ছোট দেশ ভুটানের মাথাপিছু আয় প্রায় ৪,৮৭০ ডলার। জনসংখ্যা কম হওয়া এবং ভারতে প্রচুর পরিমাণে জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করার কারণে তাদের মাথাপিছু আয় বেশ স্থিতিশীল এবং পরিবেশবান্ধব।
৩. শ্রীলঙ্কা
মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট এবং চরম মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলে আইএমএফ-এর বেইলআউট প্যাকেজের সহায়তায় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শ্রীলঙ্কা। কাঠামোগত সংস্কারের কারণে সাম্প্রতিক কিছু ডেটা আপডেট স্থগিত থাকলেও, তাদের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ৪,৫২০ ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে।
৪. বাংলাদেশ
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ নজরকাড়া। আইএমএফ-এর প্রজেকশন অনুযায়ী বাংলাদেশের নমিনাল মাথাপিছু আয় প্রায় ২,৯১০ ডলার। দেশের শক্তিশালী তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এই অগ্রগতির মূল ভিত্তি।
৫. ভারত
ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। তবে বিশাল জনসংখ্যার কারণে তাদের মোট জিডিপি অনেক বড় হলেও মাথাপিছু আয় তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী তাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ২,৮১০ ডলার। তবে আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ভারত অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
৬. পাকিস্তান
দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে রয়েছে। বর্তমানে তাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ১,৫৮০ ডলার।
৭. নেপাল
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং ভারী শিল্পের অভাবের কারণে নেপালের অর্থনীতি মূলত রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ১,৫৫০ ডলার। তবে হিমালয় কেন্দ্রিক পর্যটন খাতে তাদের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
৮. আফগানিস্তান
যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনীতি বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় তাদের অর্থনীতি প্রায় স্থবির। বর্তমানে তাদের মাথাপিছু আয় মাত্র ৪১৭ ডলারের কাছাকাছি, যা এই অঞ্চলে সর্বনিম্ন।
মূল পর্যবেক্ষণ
জনসংখ্যা বনাম মোট জিডিপি
দক্ষিণ এশিয়ার এই ডেটা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, শুধু মোট জিডিপি (Total GDP) বড় হলেই সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বেশি হয় না। ভারতের মোট জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বড় হলেও, বিশাল জনসংখ্যার কারণে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত প্রায় কাছাকাছি বিন্দুতে অবস্থান করছে।
একক উৎসের সঠিক ব্যবহার
মালদ্বীপ প্রমাণ করেছে যে, একটি দেশ যদি তার নির্দিষ্ট সম্পদকে (যেমন: পর্যটন) কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানের সেবা দিতে পারে, তবে ছোট অর্থনীতি ও কম জনসংখ্যার দেশ হয়েও মাথাপিছু আয়ে শীর্ষস্থান দখল করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের গুরুত্ব
শ্রীলঙ্কার উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রায় অসম্ভব। কাঠামোগত সংস্কার না থাকলে যেকোনো বড় অর্থনীতিও সংকটে পড়তে পারে।