বিশ্বের কিছু দেশ সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও জাতিগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আবার কিছু দেশ রয়েছে যেখানে জনসংখ্যার বিশাল অংশ একই জাতিগত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের দেশগুলোকে সাধারণত কম জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন বা অধিক সমজাতীয় (Homogeneous) দেশ বলা হয়।
জাতিগত বৈচিত্র্য পরিমাপের জন্য গবেষকরা প্রায়ই "Ethnic Fractionalization" সূচক ব্যবহার করেন। এই সূচক যত কম হয়, একটি দেশের জনসংখ্যা তত বেশি একই জাতিগত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়।
ঐতিহাসিক জাতিগত বৈচিত্র্য সংক্রান্ত ডেটাসেট Historical Index of Ethnic Fractionalization (HIEF) এবং তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম Wisevoter-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে কম জাতিগত বৈচিত্র্যের ১০টি দেশের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
১. Japan
জাপান বিশ্বের সবচেয়ে কম জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
দেশটির জনসংখ্যার প্রায় সম্পূর্ণ অংশই জাপানি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে সীমিত অভিবাসন নীতি এবং দ্বীপভিত্তিক ভৌগোলিক অবস্থান জাপানকে একটি অত্যন্ত সমজাতীয় সমাজে পরিণত করেছে।
যদিও দেশটিতে আইনু ও রিউকিউয়ান জনগোষ্ঠীর মতো কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে, তবে তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
২. North Korea
উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় পুরোটাই কোরিয়ান জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
বহির্বিশ্বের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ এবং কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশটিতে অভিবাসন প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে জাতিগত বৈচিত্র্যও অত্যন্ত কম।
৩. Bangladesh
বাংলাদেশ এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
দেশটির অধিকাংশ মানুষ বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে, তবুও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা খুবই সীমিত।
এ কারণেই বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে জাতিগতভাবে সমজাতীয় দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৪. Tunisia
তিউনিসিয়ার অধিকাংশ জনগণ আরব-বারবার বংশোদ্ভূত।
উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এখানে জাতিগত বৈচিত্র্য কম। দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা দেশটির জনসংখ্যাকে তুলনামূলকভাবে একীভূত রেখেছে।
৫. Egypt
মিশরের জনসংখ্যার বিশাল অংশ আরব মিশরীয় পরিচয়ে পরিচিত।
যদিও দেশটিতে কপটিক খ্রিস্টান ও নুবিয়ান সম্প্রদায় রয়েছে, সামগ্রিকভাবে মিশর একটি কম জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন রাষ্ট্র।
৬. Jordan
জর্ডানের অধিকাংশ জনগণ আরব বংশোদ্ভূত।
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের উপস্থিতি দেশটির জনসংখ্যার কাঠামোতে প্রভাব ফেললেও জাতিগত দিক থেকে জর্ডান এখনও তুলনামূলকভাবে সমজাতীয়।
৭. Armenia
আর্মেনিয়া বিশ্বের সবচেয়ে সমজাতীয় দেশগুলোর একটি।
দেশটির জনসংখ্যার বিপুল অংশই আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত ঐক্য এ অবস্থার অন্যতম কারণ।
৮. Comoros
আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কোমোরোসও বিশ্বের সবচেয়ে কম জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশগুলোর একটি।
এখানকার অধিকাংশ মানুষ একই ধরনের আফ্রিকান-আরব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
৯. Poland
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পোল্যান্ডের জনসংখ্যাগত কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বর্তমানে দেশটির বিশাল অংশ পোলিশ জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, ফলে ইউরোপের অন্যতম কম জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশে পরিণত হয়েছে।
১০. South Korea
দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যার অধিকাংশই কোরিয়ান জাতিগোষ্ঠীর সদস্য।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি কর্মী ও অভিবাসীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে, তবুও দেশটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে সমজাতীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সবচেয়ে কম জাতিগত বৈচিত্র্যের ১০ দেশ
| অবস্থান | দেশ |
|---|---|
| ১ | জাপান |
| ২ | উত্তর কোরিয়া |
| ৩ | বাংলাদেশ |
| ৪ | তিউনিসিয়া |
| ৫ | মিশর |
| ৬ | জর্ডান |
| ৭ | আর্মেনিয়া |
| ৮ | কোমোরোস |
| ৯ | পোল্যান্ড |
| ১০ | দক্ষিণ কোরিয়া |
জাতিগত বৈচিত্র্য কম হওয়ার সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
সম্ভাব্য সুবিধা
- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
- ভাষাগত বাধা কম থাকে।
- জাতীয় পরিচয় গঠনে সহজতা দেখা যায়।
- সামাজিক সংহতি শক্তিশালী হতে পারে।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
- নতুন সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে।
- শ্রমবাজারে অভিবাসী নির্ভরতা তৈরি হলে সামাজিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
- বৈশ্বিকায়নের যুগে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কিছু ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে।